ভালবাসি প্রকৃতি

ভালবাসি প্রকৃতি

Wednesday, August 14, 2019

জাতীয় শোক দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলিঃ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা

আমার জন্ম আটাত্তরে। একাত্তর, পচাত্তরেরও অনেক পরে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখিনি, যুদ্ধ পরবর্তী হাহাকার দেখিনি, সুবিধাবাদীদের লুটতরাজ দেখিনি, ক্ষমতালোভীদের হাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে হত্যাযজ্ঞও দেখিনি। অনেক কিছুই দেখার সুযোগ হয়নি। যখন বুঝতে শিখেছি, জানতে শিখেছি তখন থেকেই দেখেছি বঙ্গবন্ধু বিদ্বেষী মানুষের শাসন, শোষণ, ভাষন, আষ্ফালন, প্রচার, অপপ্রচার, বিকৃতি, আত্ম-স্বীকৃতির মহাউৎসব। কিন্তু আগুন কখনো চাপা থাকেনা শুনেছি সেই ছোটবেলা থেকেই। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আগুণের মত শক্তিশালী সেটা অনুভব করেছি এবং এখনও তা অনুভব করছি। দাবিয়ে রাখার শত চেষ্টায়ও সেই ভাষণ দাবিয়ে রাখতে পারেনি বঙ্গবন্ধু বিদ্বেষীরা। শত প্রতিকূলতার পরেও কানে এসেছে সেই ভাষণ। কখনো মৃদু সুরে, কখনো উচ্চ সুরে। শুনেছি সেই ভাষণ মুগ্ধ হয়ে। দল কী বুঝতাম না, দল কেন করে বুঝতাম না, দল কারাই বা করে তাও বুঝতাম না। নিজের অজান্তে তবুও হৃদয়ে গেথে গেছে সেই ভাষণ। তাইতো মনে হয় বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা, এক অবিচ্ছেদ্য নাম।

আমাদের একটা স্বাধীন দেশ হবে, একটা স্বাধীন পতাকা থাকবে, একটা সংবিধান থাকবে যেখানে থাকবে মানুষের অধিকারের কথা, মানুষে মানুষে থাকবে না ভেদাভেদ এমন চিন্তা যারা করতেন তাদের মধ্যে নেতৃত্বে ছিলেন যে মহামানব তিনিই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ মুজিবুর রহমান একদিনে মহামানব হয়ে ওঠেননি, একদিনে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেননি। দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হয়েছে মহামানব হয়ে উঠতে, বাংঙ্গালি জাতির পিতা হয়ে উঠতে। যার কাছে ধনী গরিব, মুসলিম-অমুসলিম, জাত-পাতের কোন বিচার ছিলো না, ছিলো মানবতার বিচার। তাইতো শত চেষ্টাও বঙ্গবন্ধুকে মানুষের হৃদয় থেকে সরাতে পারেনি একচুলও। বঙ্গবন্ধু তাই মুক্তিকামী মানুষের নেতা হয়ে হৃদয়ে বেঁচে আছে, থাকবে।
একটা ভাষণ মানুষকে কতটা বদলে দিতে পারে, একটা ভাষণ মানুষের মনে কতটা আশা জাগাতে পারে, একটা ভাষণ মানুষকে কতটা উদ্বুদ্ধ করতে পারে তা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ না শুনলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না। এখন মানুষের মধ্যে অবিশ্বাসের বিষ ছড়িয়ে গেছে শিরায়-উপশিরায়। নেতাদের ভাষণ এখন কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। নিজেদের সুবিধার জন্য যা-তা বলে ফেলেন মঞ্চে দাড়িয়ে। সত্যির সাথে মিথ্যার মিশ্রন এতটাই ঘটায় যে সত্যটাও তখন আর বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না বা কেউ বিশ্বাসও করে না। বঙ্গবন্ধুর নির্লোভ, নিঃস্বার্থ, বিদ্রোহী, মানব দরদী ভাষণ শুনে, তাঁর কথা বিশ্বাস করে, তাঁর কথার উপর আস্থা রেখে বুকের তাজা রক্ত দিতে ঝাপিয়ে পড়েছিলো লক্ষ লক্ষ মানুষ। সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের বুকের তাজা রক্তে লিখেছে স্বাধীন বাংলার নাম, এঁকেছে একটি স্বাধীন দেশের পতাকা, ছিনিয়ে এনেছে একটি স্বাধীন দেশের মানচিত্র। দেশ ও জাতির জন্য মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন বার বার যে মহামানব সেই আমাদের বঙ্গবন্ধু, বাঙ্গালি জাতির পিতা। নিজ স্বার্থের উর্ধ্বে উঠে দেশ ও জাতির কল্যানে বঙ্গবন্ধু যে আহবান জানিয়েছিলো জাতি তার ডাকের যথাযথ সাড়াই দিয়েছিলো সেদিন। তাইতো আজ স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবে কথা বলি, কাজ করি, মুক্ত জীবণযাপন করি।
একটি ভাষণ কতটা উদ্দীপক, কতটা জ্বালাময়ী, কতটা আবেগী, কতটা বাস্তবসম্মত, কতটা বিশ্বাসযোগ্য হলে মানুষ তাঁর কথা শুনে ঝাপিয়ে পড়েছিলো মৃত্যুর মুখ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে সেটা বর্তমান স্বাধীন দেশের দিকে তাকালেই কেবল অনুধাবন করা যায়। তাইতো দীর্ঘদিন পরে হলেও ইউনেস্কোর একটি উপদেষ্টা কমিটি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে দেয়া বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণটিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামান্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ধরনের দলিলগুলো যে ‘মেমোরি অব দা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে’ অন্তর্ভূক্ত করা হয় সে তালিকায় এ ভাষণটিকেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। সারা বিশ্ব থেকে আসা প্রস্তাবগুলো দু’বছর ধরে নানা পর্যালোচনার পর উপদেষ্টা কমিটি তাদের মনোনয়ন চূড়ান্ত করে বলে ইউনেস্কোর ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়। মূলত এর মাধ্যমে বিশ্ব জুড়ে যেসব তথ্যভিত্তিক ঐতিহ্য রয়েছে সেগুলোকে সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের যাতে তা থেকে উপকৃত হতে পারে সে লক্ষ্যেই এ তালিকা প্রণয়ন করে ইউনেস্কো। ইউনেস্কো মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। মেমোরি অব দা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে এখন পর্যন্ত অন্তর্ভূক্ত হয়েছে সব মহাদেশ থেকে ৪২৭টি গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টস বা কালেকশন। ইউনেস্কোর যে উপদেষ্টা কমিটি এ মনোনয়ন দিয়েছে সেই কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ন্যাশনাল আর্কাইভসের মহাপরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আলরাইসি। প্যারিসে ইউনেস্কো সদর দপ্তরে ওই বৈঠকে তিনি ছাড়াও উপদেষ্টা কমিটির আরও ১৪ জন সদস্য ছিলেন যারা সবাই বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞ। আজকের স্বীকৃতিই বলে দেয় সেদিনের ভাষণ শুনে বীর বাঙ্গালি কোন ভুল করেনি।
সকল মানুষের রক্তের রং একই হয় কিন্তু সকল রক্তের আচরন, স্বভাব এক নয়। কিছু রক্তের স্বভাব নির্লোভ, কিছু রক্তের স্বভাব হয় ঘাতকের। এই দেশে যেমন নবাব সিরাজ উদ দ্দৌলা, বঙ্গবন্ধুর মত মহামানব জন্ম নিয়েছিলো তেমনি কিছু মীর জাফর, ঘসেটি বেগমও জন্ম নিয়েছিলো। সকল বাঙ্গালির রক্ত পরিস্কার, নির্লোভ, উদার, ইমানদার বলা যাবে না। এ অঞ্চলে বেইমানের ছড়াছড়ি বৃটিশ শাসন-শোষণের সময় যেমন ছিলো, স্বাধীনতা পরবর্তীতেও ছিলো, আজো আছে। তাইতো মীর জাফররা, ঘসেটি বেগমরা যুগে যুগে জন্মনেয় এবং তাদের রক্তের স্বভাবসুলভ কাজগুলো করে দেখায়। বঙ্গবন্ধু কেবল দেশের জন্যই ভেবেছিলো, দেশের মানুষের কথা ভেবেছিলো। কিন্তু ঘাতকরা ভেবেছিলো তাদের স্বার্থের কথা, জিঘাংসার কথা, প্রতিহিংসার কথা। তাইতো বুলেট সেদিন ঘাতকের নিশানা খুজে পেয়েছিলো। একটি জাতির পিতা, যার জন্য পেলাম একটি স্বাধীন দেশ, যার কথায় লাখো মানুষ ঝাপিয়ে পড়েছিলো সেই বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা করতে আমাদের বুক কাপেনি এতটুকুও। কারন আমাদের রক্তে যে মীর জাফর, ঘসেটি বেগমদের রক্তের উপাদান প্রবাহমান আছে।
কষ্ট লাগে যখন ভাবতে হয় যার জন্য স্বাধীনতা পেলাম তাঁকেই হত্যা করতে বুক কাঁপেনি, হাত কাপেনি স্বাধীন দেশের ঘাতকদের। আজও ঘাতকরা ওৎপেতে আছে। আজও ঘাতকরা বুক ফুলিয়ে চলে। কতটা নির্লজ্জ হলে এমনটা করতে পারে। ঘাতকরা জানতো না, মহামানব দেহ ত্যাগ করলেই সব শেষ হয়ে যায় না, থেকে যায় তার আদর্শ, থেকে যায় তার নীতি, থেকে যায় তার বাণী, থেকে যায় তার ঐতিহাসিক ভাষণ। বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে আর নেই কিন্তু আমরা বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে, তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ অনুসরন করেই পথ চলছি। তাইতো বঙ্গবন্ধুদের মৃত্যু হয় না। যেমন মৃত্যু হবে না লাখো শহীদের রক্ত দানের-জীবন দানের ইতিহাসের, তাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশের। তাইতো সবাই বলেন, বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশ একই সূত্রে গাঁথা, এক অবিচ্ছেদ্য নাম। জাতীয় শোক দিবসে সেই মহান নেতার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

Monday, August 5, 2019

জঞ্জাল একদিনের নয়, পরিস্কারও একদিনে হবে না


জঞ্জাল একদিনে জমে না। আস্তে আস্তে জমে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বালুকনা জমতে জমতে পাহাড় না হলেও বালিয়াড়ি তৈরী হয়, বিন্দু বিন্দু জলকনা জমে সিন্ধুতে রূপ নেয় ঠিক জঞ্জালও তেমনি অল্প অল্প আকারে জমতে থাকে। একদিন তা পাহাড়সম হয়ে দাড়ায়। সেই পাহাড়সম জঞ্জাল একদিনের প্রচেষ্টায় পরিস্কারও সম্ভব নয়। তাই হঠাৎ করে অতি উৎসাহ দেখিয়ে লাভ নেই। মাঝে মাঝেই আবেগের বসে বা লোক দেখানোর জন্য আমরা জঞ্জাল পরিস্কার করতে নামি, পরিস্কারের কথাও বলি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। আমাদের প্রয়োজন জনসচেতনাত বৃদ্ধি করা, নিজ নিজ দায়িত্ববোধ সম্পর্কে অবগত থাকা, নিজ নিজ কাজগুলো যথা সময়ে সঠিকভাবে করা, আইন ও নীতিবোধের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো। তবেই মুক্তি আসবে সকল জঞ্জাল থেকে।


জঞ্জাল বলতে শুধু পূতিগন্ধময় ময়লাই নয়। দেশে সকল সেক্টরে এখন জঞ্জালে ভরা। কোন কোন জঞ্জাল গন্ধ ছড়ায় আবার কোন কোন জঞ্জাল গন্ধ ছড়ায় না। জঞ্জাল আছে অনুভব করা যায় কিন্তু গন্ধ পাওয়া যায় না। মানুষের মাঝে ভেজাল মানুষের জঞ্জাল, খাদ্যে বিষের জঞ্জাল, অফিস আদালতে ঘুষখোরের জঞ্জাল, ধর্মে লেবাসধারীর জঞ্জাল, রাস্তাঘাটে ফিটনেসবিহীন গাড়ির জঞ্জাল, রাস্তার পাশে-পরিবেশে ময়লার জঞ্জাল, রাজনীতিতে সুবিধাবাদী লোভী নেতাদের জঞ্জাল। জঞ্জালে জঞ্জালে সয়লাব হয়ে গেছে। এ জাতি এখন জঞ্জালের ভারে নূয়ে পড়ার জোগার। আর কত জঞ্জাল বয়ে বেড়াবো আমরা? এরতো একটা বিহিত করা দরকার। জঞ্জাল যখন নাকের কাছে এসে সুরসুরি দেয় তখনই আমাদের চেতনা জাগ্রত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় জঞ্জালের মোকাবিলা করছি আমরা। মশা এদেশে আগেও ছিলো, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। সেই মশা যখন ডেঙ্গুর জিবানু বহন করে পৌছে দিচ্ছে আমাদের শিরায় শিরায় ঠিক তখনই আমরা নড়েচড়ে বসছি। মানুষ মরে যখন প্রমান করলো মশা দ্বারা ডেঙ্গু জিবানু শরীরে ঢুকছে, অসুস্থ করছে মানব দেহ। ঠিক তখনই বুঝতে পারলাম জঞ্জালে এডিস আছে, ডিম পাড়ছে, বাচ্চা করছে আর আমাদের মারছে। এবার উঠে পড়ে লাগলাম জঞ্জাল পরিস্কারে। কিন্তু এডিস মশার বাসাটা আমরাই তৈরী করে দিয়েছি। যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলে রেখেছি, সেই ময়লায় পানি জমেছে, অপরিকল্পিত ভাবে ছাদকৃষি করছি, টবে পানি জমিয়ে রাখছি। সেই পানিতে পরম যত্নে ডিম পারছে এডিস সাহেব। অতঃপর ডিম ফুটে বাচ্চা এবং আমাদের কামড়ে ডেঙ্গুর জিবানু পৌছে দেয়ার কাজটি করে দিচ্ছে। ময়লা ফেলার ক্ষেত্রে যদি একটু সতর্ক হতাম, যথাযথ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট জায়গায় ময়লা ফেলতাম এবং সেই ময়লা নিয়ম মত রিসাইকেল করতাম বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করতাম তবে আজ ময়লার এত জঞ্জাল জমতো না। সখের বসে যে ছাদকৃষি করছি, টবে সুন্দর ফুল-ফল গাছ লাগাচ্ছি, সেটা যদি পরিস্কার রাখতাম তবে মশা আর ডিম পেরে বংশ বিস্তার করতে পারতো না। নাড়িকেল-ডাব খেয়ে, দই-আইসক্রিম খেয়ে, অপ্রয়োজনীয় গাড়ির টায়ারটা পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে সেখানে মশার বংশ বিস্তারের সুযোগ করে দিচ্ছি আমরাই। তা যদি না করতাম তবে আজ এডিস নিয়ে এতো চিন্তা করতে হতো না।

আজ যখন এডিস মশার দাপট শুরু হয়েগেছে ঠিক তখন আমাদের চেতনা জাগ্রত হয়েছে। ঝাড়ু নিয়ে নেমে পড়ছি পরিস্কার রাস্তায় যে রাস্তাটা হয়তো একটু আগেই কোন প্রকৃত সেবক ঝাড়ুদার তার দায়িত্ব হিসাবে বা নির্ধারিত কাজ হিসাবে পরিস্কার করে গেছে। নির্লজ্জ, বেহায়ার মত একটা ঝাড়ুর হাতলে তিন-চারজনে ধরে ঝাড়ু দেয়ার ভান করছি। চোখে কালো সানগ্লাস লাগিয়ে, কেউ কেউ জামার উপর গেঞ্জি পড়ে মাঠে নেমেছি। অথচ ঐ গেঞ্জিটা আসল ঝাড়ুদারকে দিলে সে পরম যত্নে গায়ে দিতো। কেউ কেউ ভুড়ির কারনে ঝাড়ু ধরে নিচু হতে পারে না। এভাবে ক্যামেরার সামনে আসার কি দরকার আমাদের? হয়তো অনেকেই বলবেন, এটা একটা প্রতীকী রূপ। মানুষকে উৎসাহিত করতে এটা করছেন। তাদের দেখে সাধারণ মানুষ উদ্ভুদ্ধ হবেন, ঝাপিয়ে পরবেন ময়লার স্তুপে! বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন প্রতীকী কাজও বিরুপ কর্ম হয়ে দাড়ায়। মানুষ উদ্ভুদ্ধ হওয়ার চেয়ে ঘৃণাই প্রকাশ করে বেশি। যারা এমনটা করছে তারা হয়তো ভাবছে মানুষ এসব ভন্ডামি বোঝে না, কিন্তু তারা এটা বোঝে না যে মানুষ এখন সব বুঝতে পারে!

এটাতো গেলো জঞ্জালের কারনে প্রকৃতির এক বিরূপ আচরনের কথা। দেশে আরও জঞ্জাল আছে। আগেই যেটা বলেছি। অফিস আদালতে ঘুষ বাণিজ্যের কারনে কোন কাজই ন্যায়সঙ্গত ভাবে করা যায় না। অফিস আদালতে ঘুষখোররা হচ্ছে জঞ্জাল। মাঝে মাঝেই দুদক সহ বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ এসব জঞ্জাল সামনে নিয়ে আসে। কিন্তু সেটা মাছ দিয়ে উদাহরণ টানলে বলা যায় চুনোপুটির সাইজ। রাঘব বোয়ালদের ধরা হয় না। আর রাঘব বোয়ালরা বহাল তবিয়তে থাকার কারনে ঘুষখোর জঞ্জাল পরিস্কারের মহরা দেখে আমরা হাসি। সেটা কর্তৃপক্ষ হয়তো বুঝতে চায় না বা পারে না।

খাদ্যে এক আজব জঞ্জাল ভেজাল। ভেজালে ভেজালে, বিষে বিষে খাদ্য এখন অখাদ্য হয়ে যাচ্ছে। ছাগল কম খেলে কিছু হয় না, কিন্তু বেশি খেলে পেট ফুলে মরে। আমাদের অবস্থাও এখন ছাগলে মত কম খাদ্যে বেশি বেশি ভেজাল খেয়ে মরতে হবে। দেশে কতজনই বা মাদক সেবন করেন? গুটিকতেক লোক মাদক সেবন ও ব্যবসা করে তার জন্য আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করি। অথচ ষোল কোটি মানুষ যে খাবার খায় সেই খাবারে দেদারছে বিষ মেশাচ্ছে, ভেজাল মেশাচ্ছে তার জন্য যুদ্ধ ঘোষণা করি না। যতটুক কাজ হয় তা আই ওয়াশ বলেই আমাদের কাছে বিবেচিত হয়। খাদ্যে যারা ভেজাল দেয় তারাও সমাজে খাদ্যের জঞ্জাল হিসাবেই গণ্য। এদেরও পরিস্কার করা উচিত।

আরও জঞ্জাল আছে। এত জঞ্জাল নিয়ে কচলালে আমার এ লেখাটাকেই মানুষ জঞ্জাল ভেবে ভাগাড়ে ফেলে দিবে। তাই থেমে যাওয়াই শ্রেয় বলে মনে হয়। তার পরেও কিছু কথা না বললেই নয়। প্রতিটি সেক্টরের জঞ্জালগুলো একদিনে স্তুপ হয়নি। আস্তে আস্তে হয়েছে। আস্তে আস্তেই পরিস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। আমরা যদি আমাদের যার যার দায়িত্ব, কর্তব্য সঠিক ভাবে করি তবে একদিন পরিচ্ছন্ন দেশ হয়ে যাবে সোনার বাংলাদেশ। রাত পোহালেই একটি পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ দেখতে পাবো এটা আশা করা ভুল এবং আমরা কেউ আশাও করি না। আমরা জঞ্জালে পেচিয়ে গেছি। এর থেকে বের হতে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে, সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে হবে, ন্যায়-নীতিবোধ সমুন্নত রাখতে হবে, অপরের প্রতি সহনশীল হতে হবে। এমন আরো অনেক কথা বলা যাবে। আর কথাগুলো আমরা সবাই জানি এবং বুঝি। একটু সচেতন ও সক্রিয় হলেই আমরা সুন্দর একটা দেশে সু-নাগরিক হিসাবে জীবনযাপন করতে পারবো। তাই সবশেষে আবারও বলবো, জঞ্জাল একদিনের নয়, পরিস্কারও একদিনে হবে না। তাই হতাশ না হয়ে সক্রিয় হই।

Friday, August 2, 2019

জাজিরাতেই থাকছে তাঁতপল্লী। ধন্যবাদ প্রিয় নেতা ইকবাল হোসেন অপু

শরীয়তপুরের জাজিরায় শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী হবে এমন খবরে যেমন আমরা খুশি হয়েছিলাম তেমনি অনিয়ম ও দুর্নীতির অযুহাতে বলি আর অনিয়ম ও দুর্নীতির কারনেই বলি, এ প্রকল্প স্থানান্তরের খবরে হতাশ হয়েছিলাম আমরা শরীয়তপুরের সর্বস্তরের জনগন। শরীয়তপুরের মাটি ও মানুষের নেতা সাংসদ ইকবাল হোসেন অপু জাজিরা থেকে প্রকল্পটি চলে যাওয়া রোধ করে পূর্ব নির্ধারিত স্থানে পূনর্বহাল করার বিষয়ে নিবিরভাবে কাজ করেছেন। প্রায় হাতছাড়া হয়ে যাওয়া প্রকল্প পূনরায় বহাল করায় আনন্দিত শরীয়তপুরবাসী। ধন্যবাদ প্রিয় নেতা ইকবাল হোসেন অপু। তবে ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে নেই, থেমে থাকবে না! প্রকল্পের শেষ পর্যন্ত আপনার নজরদারী খুবই প্রয়োজন। এই প্রকল্প শুধু শরীয়তপুর-১ (পালং-জাজিরা) এলাকার জনগণের জন্য নয়, এটা পুরো শরীয়তপুরবাসীর জন্য একটা উন্নয়ন উপহার, যার সুবিধা ভোগ করবে সমস্ত শরীয়তপুরবাসী। এমন একটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছাড়া সম্ভব নয়, আর সেই কাজটিই করে দেখিয়েছেন আমাদের রাজনীতিবীদ সাংসদ ইকবাল হোসেন অপু।  
সারা দেশের মত উন্নয়ন বঞ্চিত দক্ষিণাঞ্চলের জন্য গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার রয়েছে নানান উন্নয়ন পরিকল্পনা। তারই ধারাবাহিকতায় মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় এক হাজার ৯১১ কোটি টাকা ব্যয়ে তাঁতপল্লী নির্মানের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ প্রকল্পটির জন্য শিবচর উপজেলার কুতুবপুরে ৬০ একর ও শরীয়তপুরের জাজিরায় ৪৮ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁতপল্লীতে থাকবে কারখানা, আবাসন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণসহ আধুনিক সব সুবিধা। মিরপুরের বেনারসি পল্লীর তাঁতিরাও এ পল্লীর অর্ন্তভূক্ত হবেন। প্রধানমন্ত্রী ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পদ্মা সেতুর দ্রুত বাস্তবায়নের সঙ্গে এ এলাকায় তাঁতপল্লী স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ায় নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন এ অঞ্চলের তাঁতিরা। ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাঁতপল্লীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও জায়গা নির্ধারণ হয়েছে আরও আগেই। দুই মাসের মধ্যে শুরু হবে মাটি ভরাটের কাজ। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৫৩ কোটি টাকা। এতে ৬ তলা বিশিষ্ট ভবনগুলোতে প্রত্যেক তাঁতির জন্য ৬০০ ফুটের কারখানা ও ৮০০ ফুটের মধ্যে আবাসন সুবিধা থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে সুতা-রঙসহ কাঁচামালের সুবিধা দেওয়া হবে। নির্মাণ হবে আর্ন্তজাতিক মানের শোরুম ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তাঁতিদের ছেলেমেয়েদের জন্য থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। 
তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী এই পদ্মাপাড়ে তাঁতপল্লী গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নিয়েছেন তাতে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবার পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে। এখানে সয়েল টেস্ট শেষে বিভিন্ন ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ২৫৩ কোটি টাকার কাজ শেষ করব। মূল প্রকল্প ১ হাজার ৯১১ কোটি টাকার। এটি একটি মেগা প্রকল্প। এখানে ঢাকার মিরপুরের বেনারসি পল্লীর তাঁতি ও এই অঞ্চলের তাঁতিদের পুনর্বাসন করা হবে। তাদের প্রত্যকের জন্য আধুনিক অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। তাঁতিদের বিনামূল্যে অথবা ন্যায্যমূল্যে সুতা, রঙসহ বিভিন্ন কাঁচামাল সরবরাহ করা হবে। রঙ করা, ফ্যাশন ডিজাইনসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। এই খবরে শরীয়তপুর সহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ আশার আলো দেখতে পায়। দীর্ঘ উন্নয়ন বঞ্চিত দক্ষিণাঞ্চলের শরীয়তপুর জেলায় নানান প্রকল্প বাস্তমায়নে আর্থসামাজিকভাবে সাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে এখন এলাকার ভাগ্যবঞ্চিত মানুষ।   
জননেত্রীর এই মহতি উদ্যোগের খবর প্রচার পাওয়ার সাথে সাথেই একশ্রেণীর প্রতারক দালাল চক্র শুরু করে টাকা হাতিয়ে নেয়ার ফন্দি। অধিগ্রহণ করা হবে এমন জমিতে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তোলা হয় বিভিন্ন স্থাপনা ও রোপন করা হয় গাছপালা। এমন অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরে অনিয়ম রোধে মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের জাজিরায় ১৯শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হতে যাওয়া শেখ হাসিনা তাঁতপল্লীর পূর্ব নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করার ঘোষণা জানিয়ে দেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী। চিফ হুইপ গণমাধ্যমকে জানান, শেখ হাসিনা তাঁতপল্লীর নির্ধারিত স্থানে অবৈধ স্থাপনা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে দেখা গেছে এখানে ভালো কিছু হচ্ছে না। আমাদের নির্দেশনায় মাদারীপুরের প্রশাসন অবৈধ সব স্থাপনা ভেঙে ফেলেছে। কিন্তু শরীয়তপুরের প্রশাসন কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। গত ২৪ মার্চ পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আজম, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সবাই একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব এলাকায় অবৈধভাবে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে সেসব এলাকা এই প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হবে। এছাড়াও তিনি বলেন, দুই জেলায় এমন একটি প্রকল্প করতে গেলে শুধু এই অনিয়মই নয় ভবিষ্যতে আরও কিছু সমস্যা হবে। তাই সংসদীয় কমিটি, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সবাই একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী একই উপজেলায় করা হবে। আর এ জন্য মাদারীপুরের শিবচরের কুতুবপুর এলাকায় জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী জাজিরা থেকে সরিয়ে নেয়ার ঘোষণায় শরীয়তপুরের সর্বস্তরের মানুষের মনে চরম ক্ষোভের ও হতাশার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে সেই হতাশার মেঘ কাটাতে শরীয়তপুর-জাজিরা বাসীর সাংসদ এ অঞ্চলের প্রিয় নেতা ইকবাল হোসেন অপু মাঠে নামেন। বাঙ্গালি জাতির শেষ ভরসার আশ্রয়স্থল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে এবিষয়ে সুবিন্যস্ত আকারে ব্যাখ্যা করে এর ইতিবাচক-নেতিবাচক (মেরিট-ডিমেরিট) সবকিছু উপস্থাপন করেন প্রিয় নেত্রীর একান্ত স্নেহের সুযোগ্য সাংসদ নন্দিত জননেতা ইকবাল হোসেন অপু। মুহুর্তেই দুর হয়ে যায় সকল হতাশার কালো মেঘ। টিকে যায় জাজিরা অংশের তাঁতপল্লী। জাজিরা এলাকায় একাধিক বৈঠক করে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ে তিনি স্থানীয় মানুষকে বুঝাতে চেষ্টা করেন প্রকল্পের গুরুত্ব এবং আমাদের জন্য প্রকল্পটি কতটা আশীর্বাদের। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে শরীয়তপুরের জাজিরাতেই পূর্বনির্ধারিত জায়গায় প্রকল্প বহাল করেন। এলাকার উন্নয়নে একজন রাজনীতিবীদের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, শ্রম কখনো বৃথা যেতে পারে না তা প্রমান করেছেন সাংসদ ইকবাল হোসেন অপু। সাংসদের আন্তরিক চেষ্টায় স্থানীয় লোকজন তাদের স্থাপিত ঘড়-বাড়ি, গাছপালা সরিয়ে নেয় এবং প্রশাসন চাপে পড়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে যা শরীয়তপুরবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।     
যখন প্রকল্পের শরীয়তপুর অংশটি একটি প্রবল ক্ষমতাধর চক্রের ষড়যন্ত্রে হাতছারা হওয়ার দারপ্রান্তে, ঠিক তখনি শেষ ভরসার আশ্রয়স্থল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করে এবিষয়ে সুবিন্যস্ত আকারে ব্যাখ্যা করে এর ইতিবাচক-নেতিবাচক (মেরিট-ডিমেরিট) সবকিছু উপস্থাপন করেন প্রিয় নেত্রীর একান্ত স্নেহের সুযোগ্য সাংসদ নন্দিত জননেতা ইকবাল হোসেন অপু। মুহুর্তেই দুর হয়ে যায় সকল হতাশার কালো মেঘ। টিকে যায় জাজিরা অংশের তাঁতপল্লী। শরীয়তপুরের জাজিরায় তাঁতপল্লী বহাল রাখার জন্য যে আন্তরিকতা, বিচক্ষণতা পরিচয় দিয়েছেন এবং যে শ্রম ও মেধা কাজে লাগিয়েছেন প্রিয় নেতা ইকবাল হোসেন অপু তার জন্য শরীয়তপুরবাসী চির কৃতজ্ঞ থাকবে। তাঁতপল্লী চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তের খবরে কুচক্রী মহলের প্রতি যতটা ঘৃণা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছিলো প্রকল্প বহাল হওয়ার খবরে তার চেয়ে অনেক বেশি আনন্দিত হয়েছে শরীয়তপুরবাসী। শরীয়তপুরবাসীর একজন হিসাবে বলতে চাই, ধন্যবাদ জননেতা ইকবাল হোসেন অপু। আপনার আন্তরিকতা, বিচক্ষণতা, নিষ্ঠা, শ্রম শরীয়তপুরবাসী চিরদিন শ্রদ্ধাভরে মনে রাখবে।    

ডেঙ্গু প্রতিরোধে চাই সমন্বিত উদ্যোগ

বর্তমানে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। যে হারে ডেঙ্গু রোগির সংখ্যা বাড়ছে তাতে মহামারির আকার ধারণ করতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে মহামারির আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সরকারের একার পক্ষে এ ধরনের একটি সংকট মোকাবেলা সম্ভব নয়। সংকট সরকার একা তৈরী করেনি। তৈরী করেছি আমরা নাগরিকরাই। যত্র তত্র ময়লা আবর্জনা ফেলে, এডিস মশার বংশ বিস্তারের পথ তৈরী করেছি আমরা। তাই সরকার একা নয় আমাদেরও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন কর্মে মনোযোগী হওয়া উচিত। আমরা যদি প্রত্যেকে যার যার জায়গা থেকে সচেষ্ট না হই তবে আমাদের জন্য এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। আসুন আমরা সবাই হাতে হাতে কাজ করি, ডেঙ্গুর উৎস ধ্বংস করি, সুস্থ থাকি, অপরকেও সুস্থ্য থাকতে হাত বাড়াই। 
প্রথমেই জানা দরকার ডেঙ্গু জ্বর কী ও কিভাবে ছড়ায়ঃ ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা এবং এই ভাইরাস বাহিত এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার কামড়ে। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে, সেই ব্যক্তি ৪ থেকে ৬ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোন জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে, সেই মশাটিও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। ডেঙ্গু প্রধানত দুই ধরনের হয়-ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার এবং ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার।
ডেঙ্গু জ্বর কখন ও কাদের বেশি হয়ঃ মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, বিশেষ করে গরম এবং বর্ষার সময়টাতেই ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেশি থাকে। শীতকালে এই জ্বর হয় না বললেই চলে। শীতে লার্ভা অবস্থায় ডেঙ্গু মশা অনেক দিন বেঁচে থাকতে পারে। বর্ষার শুরুতেই সেগুলো থেকে নতুন করে ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত মশা বিস্তার লাভ করে। সাধারণত শহর অঞ্চলে অভিজাত এলাকায়, বড় বড় দালান কোঠায় ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব বেশি, তাই ডেঙ্গু জ্বরও এই এলাকার বাসিন্দাদের বেশি হয়। বস্তিতে বা গ্রামে বসবাসরত লোকজনের ডেঙ্গু কম হয় বা একেবারেই হয় না বললেই চলে। ডেঙ্গু ভাইরাস ৪ ধরনের হয়ে থাকে। তাই ডেঙ্গু জ্বরও ৪ বার হতে পারে। যারা আগেও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু হলে তা মারাত্মক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি বেশি দেখা যায়।
ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণসমূহঃ ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরে সাধারণত তীব্র জ্বর ও সে সঙ্গে সারা শরীরে প্রচন্ড ব্যথা হয়ে থাকে। জ্বর ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়। শরীরে বিশেষ করে হাড়, কোমড়, পিঠসহ অস্থি সন্ধি এবং মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা হয়। এছাড়া মাথাব্যথা ও চোখের পেছনে ব্যথা হয়। অনেক সময় জ্বর এত তীব্র হয় যে মনে হয় বুঝি হাড় ভেঙে যাচ্ছে। তাই এই জ্বরের আরেক নাম ব্রেক বোন ফিভার। জ্বর হওয়ার ৪ বা ৫ দিনের সময় সারা শরীরজুড়ে লালচে দানা দেখা যায়, যাকে বলা হয় স্ক্রি র‌্যাশ, অনেকটা এলার্জি বা ঘামাচির মতো। এর সঙ্গে বমি বমি ভাব, এমনকি বমি হতে পারে। রোগী অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ করে এবং রুচি কমে যায়। সাধারণত ৪ বা ৫ দিন জ্বর থাকার পর তা এমনিতেই চলে যায় বরং কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে এর ২ বা ৩ দিন পর আবার জ্বর আসে। একে বাই ফেজিক ফিভার বলে।
ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বরঃ এই অবস্থাটাই সবচেয়ে জটিল। এই জ্বরে ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও উপসর্গের পাশাপাশি আরো যে সমস্যাগুলো হয়, তা হলো-শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে রক্ত পড়া শুরু হয়, যেমন- চামড়ার নিচে, নাক ও মুখ দিয়ে মাড়ি ও দাঁত হতে, কফের সঙ্গে, রক্তবমি, পায়খানার সঙ্গে তাজা রক্ত বা কালো পায়খানা, চোখের মধ্যে এবং চোখের বাহিরে, মহিলাদের বেলায় অসময়ে ঋতু¯্রাব অথবা রক্তক্ষরণ শুরু হলে অনেকদিন পর্যন্ত রক্ত পড়তে থাকা ইত্যাদি। এই রোগের বেলায় অনেক সময় বুকে পানি, পেটে পানি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। অনেক সময় লিভার আক্রান্ত হয়ে রোগীর জন্ডিস, কিডনিতে আক্রান্ত হয়ে নোল ফেইলিউর ইত্যাদি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডেঙ্গু শক সিনড্রোমঃ ডেঙ্গু জ্বরের ভয়াবহ রূপ হল ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের সঙ্গে সার্কুলেটরি ফেইলিউর হয়ে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হয়। এর লক্ষণ হল-রক্তচাপ হঠাৎ কমে যাওয়া, নাড়ীর স্পন্দন অত্যন্ত ক্ষীণ ও দ্রুত হয়, শরীরের হাত পা ও অন্যান্য অংশ ঠান্ডা হয়ে যায়, প্র¯্রাব কমে যায়, হঠাৎ করে রোগী জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারে। এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
কখন ডাক্তার দেখাবেনঃ ডেঙ্গু জ্বরের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তবে এই জ্বর সাধারণত নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। তাই উপসর্গ অনুযায়ী সাধারণ চিকিৎসাই যথেষ্ট। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়াই ভালো। শরীরের যে কোনো অংশ থেকে রক্তপাত হলে, প্লাটিলেটের মাত্রা কমে গেলে, শ্বাসকষ্ট হলে বা পেট ফুলে পানি এলে, প্র¯্রাবের পরিমাণ কমে গেলে, জন্ডিস দেখা দিলে, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা দুর্বলতা দেখা দিলে, প্রচন্ড পেটে ব্যথা বা বমি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।
কী কী পরীক্ষা করা উচিতঃ আসলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডেঙ্গু জ্বর হলে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার দরকার নাই, এতে অযথা অর্থেল অপচয় হয়। জ্বরের ৪-৫ দিন পরে সিবিসি এবং প্লাটিলেট করাই যথেষ্ট। এর আগে করলে রিপোর্ট স্বাভাবিক থাকে এবং অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়তে পারেন। প্লাটিলেট কাউন্ট ১ লাখের কম হলে, ডেঙ্গু ভাইরাসের কথা মাথায় রেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। ডেঙ্গু এন্টিবডির পরীক্ষা ৫ বা ৬ দিনের পর করা যেতে পারে। এই পরীক্ষা রোগ শনাক্তকরণে সাহায্য করলেও রোগের চিকিৎসায় এর কোনো ভূমিকা নেই। প্রয়োজনে ব্লাড সুগার, লিভারের পরীক্ষাসমূহ যেমন-এসজিপিটি, এসজিওটি, এলকালাইন ফসফাটেজ ইত্যাদি করা যাবে। এছাড়াও প্রয়োজনে পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম, বুকের এক্সরে ইত্যাদি করা যাবে। চিকিৎসক যদি মনে করেন যে রোগী ডিআইসি জাতীয় জটিলতায় আক্রান্ত, সেক্ষেত্রে প্রোথ্রোম্বিন টাইম, এপিটিটি, ডি-ডাইমার ইত্যাদি পরীক্ষা করতে পারেন।
ডেঙ্গু জ্বরের চিকিৎসা কী করতে হবেঃ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগী সাধারণত ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়, এমনকি কোনো চিকিৎসা না করালেও। তবে রোগীকে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই চলতে হবে, যাতে ডেঙ্গুজনিত কোনো মারাত্মক জটিলতা না হয়। ডেঙ্গু জ্বরটা আসলে একটা গোলমেলে রোগ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হয়। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে-সম্পূর্ণ ভালো না হওয়া পর্যন্ত বিশ্রামে থাকতে হবে, যথেষ্ট পরিমাণে পানি, শরবত, ডাবের পানি ও অন্যান্য তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। খেতে না পারলে দরকার হলে শিরাপথে স্যালাইন দেয়া যেতে পারে। জ্বর কমানোর জন্য শুধুমাত্র প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ যথেষ্ট। এসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাক জাতীয় ব্যথার ওষুধ কোনোক্রমেই খাওয়া যাবে না। এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়বে। জ্বর কমানোর জন্য ভেজা কাপড় দিয়ে গা মোছাতে হবে।
সমন্বিত পদক্ষেপঃ মশা ও মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে কীটতত্ত্ববিদ, পরিবেশবিদ, মেডিকেল ও ভেটেরিনারি পেশার ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত কমিটির মতামত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়ন করার জন্য স্বাস্থ্যকর্মী, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, রাজনৈতিক নেতাদের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। এ ছাড়া জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে পত্রপত্রিকা, রেডিও, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করতে হবে।
মশা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম। শুষ্ক ও আর্দ্র উভয় মৌসুমে এডিস মশা সক্রিয় থাকে, তবে বর্ষার সময় এদের আধিক্য দেখা যায়। তাই এ সময়ে জরুরি ভিত্তিতে মশা মারতে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে প্রয়োজনীয় কীটনাশক স্প্রে করা প্রয়োজন। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। মশা ও অন্য রোগবাহী কীট নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি জেলায় স্থানীয় ইউনিট তৈরি করে সমন্বয়ের মাধ্যমে সারা বছর কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। মশার প্রজনন স্থান নির্ণয় ও নির্মূল করা মশা নিয়ন্ত্রণের একটি কার্যকরী অংশ। এডিস মশা স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। জমে থাকা পানি পরীক্ষা করে সেখানকার মশার লার্ভা নষ্ট করতে হবে। মশার বাসস্থানের পানিতে কেরোসিন বা মবিল ঢেলে মশার প্রজনন রোধ করা যায়। তবে তা পরিবেশবান্ধব নয়। এসবের পরিবর্তে সয়াবিন বা অন্য যেকোনো সহজলভ্য তেলজাতীয় পরিবেশবান্ধব পদার্থ ব্যবহার করতে হবে। এসব পদার্থ পানির ওপরে একটি স্তর তৈরি করে মশার লার্ভাকে অক্সিজেন নিতে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে লার্ভাগুলো সহজেই মারা যায়। কিন্তু মাছ চাষের জায়গায় তেলজাতীয় পদার্থ ব্যবহার করা যাবে না, এতে মাছও মারা যাবে। এভাবে বাড়ির আশপাশে, পরিত্যক্ত জায়গায় বা ড্রেনের জমে থাকা পানিতে তেল ব্যবহার করে সহজেই মশার প্রজনন রোধ করা সম্ভব। ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করেও মশার লার্ভা মারা যায়।
ডেঙ্গু জ্বর কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়ঃ ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধের মূল মন্ত্রই হল এডিস মশার বিস্তার রোধ এবং এই মশা যেন কামড়াতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা। মনে রাখতে হবে, এডিস একটি ভদ্র মশা, অভিজাত এলাকায় বড় বড় সুন্দর সুন্দর দালান-কোঠায় বসবাস করে। স্বচ্ছ পরিষ্কার পানিতে এই মশা ডিম পাড়ে। ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত ড্রেনের পানি এদের পছন্দসই নয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানগুলোকে পরিষ্কার রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে মশক নিধনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। বাড়ির আশপাশের ঝোপঝাড়, জঙ্গল, জলাশয় ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। যেহেতু এডিস মশা মূলত এমন বস্তুর মধ্যে ডিম পাড়ে যেখানে স্বচ্ছ পানি জমে থাকে, তাই ফুলদানি, অব্যবহৃত কৌটা, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে। ব্যবহৃত জিনিস যেমন মুখ খোলা পানির ট্যাংক, ফুলের টব ইত্যাদিতে যেন পানি জমে না থাকে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরের বাথরুমে কোথাও জমানো পানি ৫ দিনের বেশি যেন না থাকে। একুরিয়াম, ফ্রিজ বা এয়ার কন্ডিশনারের নিচেও যেন পানি জমে না থাকে। এডিস মশা সাধারণত সকাল ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তবে অন্য সময়ও কামড়াতে পারে। তাই দিনের বেলা শরীর ভালোভাবে কাপড়ে ঢেকে বের হতে হবে, প্রয়োজনে মসকুইটো রিপেলেন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের চারদিকে দরজা জানালায় নেট লাগাতে হবে। দিনে ঘুমালে মশারি টাঙিয়ে অথবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘুমাতে হবে। বাচ্চাদের যারা স্কুলে যায়, তাদের হাফপ্যান্ট না পরিয়ে ফুল প্যান্ট বা পায়জামা পরিয়ে স্কুলে পাঠাতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই সব সময় মশারির মধ্যে রাখতে হবে, যাতে করে রোগীকে কোন মশা কামড়াতে না পারে। ডেঙ্গু জ্বর হয়তো বা নির্মূল করা যাবে না। এর কোনো ভ্যাক্সিনও বের হয় নাই, কোনো কার্যকরী ওষুধও আবিস্কৃত হয় নাই। ডেঙ্গু জ্বরের মশাটি আমাদের দেশে আগেও ছিল, এখনও আছে, মশা প্রজননের এবং বংশবৃদ্ধির পরিবেশও আছে। তাই ডেঙ্গু জ্বর ভবিষ্যতেও থাকবে। একমাত্র সচেতনতা ও প্রতিরোধের মাধ্যমেই এর হাত থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।

Tuesday, July 23, 2019

গুজব


গুজব গুবজ সারা দেশে
গুজবে চলছে হত্যা
গুজবে আজ হুমকির মুখে
মানব জাতির সত্তা।

মারছে পাগল, ভবঘুরে
মারছে দেখুন মাকে
ছেলে ধরা সুর তুলে আজ
মারছে যাকে তাকে।

মাথা লাগবে সেতুর নিচে
এমন গুজব তুলে
যাকে তাকে দিচ্ছি প্রহার
মানবতা ভুলে।

মা হারাচ্ছে অবুঝ শিশু
বাবা হারায় কেউ
দেখে হৃদয়ে আস্ত্রে পড়ে
কষ্ট নামের ঢেউ।

গুজবে কান দিয়ে আজ
মারছে যাকে তাকে
মৃতের জন্য মৃতের ঘরেও
অপেক্ষায় কেউ থাকে!

অপরাধের বিচার আছে,
তোমার কী করার কথা?
সবার মনে জাগাতে হবে
সত্যি মানবতা।

Monday, July 22, 2019

প্রসঙ্গ ছেলেধরা ও গণপিটুনিঃ তুবা-মিনজু, ক্ষমা করে দিস মা!

গুজব কারো কারো জন্য গজব হয়ে দেখা দিচ্ছে এখন। দেশে গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা সাম্প্রতিক সময়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গণপিটুনির এই তালিকায় ভিক্ষুক, বাক-প্রতিবন্ধী, প্রতিবন্ধীসহ উচ্চ শিক্ষিত নারীরাও বাদ যাচ্ছে না। এখনই যদি এই গুজব ও আইন নিজেদের হাতে তুলে নেয়ার প্রবনতা থামানো না যায় তবে যে কেউই হতে পারে ভিকটিম। গুজবের কাছে আমরা কেউই এখন আর নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছি না। সরকারকে কঠোর হস্তে দমন ও বিষয়টিতে নজর দিতে হবে। আমাদেরও সচেতন হতে হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে ‘পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে এ ধরনের গুজবের সূত্র ধরেই মূলত ‘ছেলে ধরা বা অপহরণকারী সন্দেহে গণপিটুনির সূত্রপাত হয়। জুলাই মাস ধরে এ ধরনের গুজবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ‘ছেলে ধরা সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে ২১ জুলাই রোববার পর্যন্ত নিহত হয়েছে ১১ জন এবং চার জেলায় এক দম্পতিসহ আহত হয় ৫০ জনের অধিক। এই পরিসংখ্যান থেমে নেই। যদিও পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসন ‘মানুষের মাথালাগার বিষয়টিকে পুরোপুরি গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তারপরও ছেলে ধরা সন্দেহ ও গণপিটুনি থেমে নেই। পুলিশ প্রশাসন থেকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হচ্ছে ‘গণপিটুনির ঘটনা একটি ফৌজদারী অপরাধ। এধরনের অপরাধ থেকে বিরত থেকে কাউকে সন্দেহ হলে পুলিশে সোপর্দ করুন। কিন্তু কোন কিছুতেই শুনছে না হুজুগে বাঙ্গালি। দুটি ঘটনার বিবরণ শুনলে আপনার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাবে। কতটা নিষ্ঠুর হলে মানুষ এমটা করতে পারে?

ঘটনা-১। স্কুলে সন্তানের ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন তাসলিমা বেগম রানু। হঠাৎ ছেলেধরা অভিযোগ তুলে অনেকেই তসলিমা বেগম রেনুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাকে গণপিটুনি দেয়া হলে তিনি নিহত হন। তাসলিমা বেগম রানু তার ৪ বছরের মেয়ে তাসনিম তুবাকে ভর্তি করাতে খোঁজ-খবর নিতে বাড্ডার একটি স্কুলে গিয়েছিলেন। সন্তানরা জানেন না ছেলেধরা গুজবে এই সমাজের মানুষরাই তাদের মমতাময়ী মাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। যে তুবার ভর্তির খোঁজ নিতে গিয়েছিলো সেই তুবা জানেনা তার মা আর ফিরে আসবে না, তাকে আর কোনদিন আদর করবে না! গণপিটুনির ভিডিওটি মুহুর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, বাড্ডার অল্প কয়েকজন যুবকই মারছে তাকে। বাকিরা দেখছে, কেউ কেউ কাছ থেকে মোবাইলে ভিডিও করছে। ৮-১০ মিনিট লাঠিপেটার পর আবার উপর্যুপরি লাথি দেয়া হয়। আধা ঘণ্টারও বেশি সময় গণপিটুনির পর শনিবার সকাল ১০টার দিকে তাসলিমা বেগম রেনুকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে তিনি মারা যান। এ অবস্থায় তাসলিমা বেগম রেনুর পরিবারে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। লেখাপড়া শেষ করে চাকরি করেছিলেন আড়ং, ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানে, পড়িয়েছিলেন স্কুলেও। বিবাহ বিচ্ছেদের পর ঘরেই কাটাচ্ছিলেন অধিকাংশ সময়। উচ্চ শিক্ষিতা সংগ্রামী একজন নারীর ভাগ্যে এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছে না কেউ। গত দুই বছর আগে স্বামী তসলিম হোসেনের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় তার। এরপর ছেলে তাহসিন আল মাহিদকে (১১) তার বাবা তসলিম হোসেন নিয়ে যায়। সে নোয়াখালীর চাটখিলে তার এক ফুফুর কাছে মানুষ হচ্ছে। তাসলিমা বেগম রানু মেয়ে তাসমিন তুবাকে (৪) নিয়ে মহাখালী ওয়ার্লেস গেটে জিপি জ-৩৩/৩ নং বাসায় ভাড়া থাকতেন। কিছুদিনের মধ্যেই রানুর আমেরিকা যাওয়ার কথা ছিলো। যেতে পারলে হয়তো তার সন্তানদের জন্য আরো উজ্জল ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে পারতেন। কিন্তু কিছু হুজুগে বাঙ্গালি রানু ও তুবাদের সব স্বপ্ন মূহুর্তের মধ্যে নিঃশেষ করে দিলেন।

ঘটনা-২। গত আট মাস আগে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে অন্য ছেলের সঙ্গে পালিয়ে যায় স্ত্রী। এরপর থেকেই একা হয়ে যান বাক-প্রতিবন্ধী সিরাজ। বাক-প্রতিবন্ধী হওয়ায় দুঃখ বুঝানোর তেমন কেউ ছিলো না। স্ত্রীকে ভুলে গেলেও মেয়ে মিনজুকে ভুলতে পারেননি তিনি। তাই তাদের চলে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিনই মেয়ের খোঁজ নিতে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন সিরাজ। এক পর্যায়ে দুই মাস আগে সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি আলামিননগর এলাকায় কাজ করতে গিয়ে রাস্তায় মেয়ে মিনজুকে দেখতে পান সিরাজ। সেই থেকে তিন-চারদিন পরপরই সকালে স্কুলে যাওয়ার রাস্তায় মেয়েকে দেখতে যেতেন হতভাগা সিরাজ। ২০ জুলাই সকালে মেয়েকে দেখতে যান আর সেই দেখাই হয় বাবা-মেয়ের শেষ দেখা। সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পাগলাবাড়ির সামনে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে অজ্ঞাত পরিচয় যুবক হিসাবে নিহত হন। পরে রাতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমে ছবি দেখে থানায় গিয়ে লাশ শনাক্ত করে নিহতের পরিবার। নিহতের পরিবার জানায়, সিরাজ ছেলেধরা নয় বরং বাক-প্রতিবন্ধী। নিজের মেয়ের সঙ্গে লুকিয়ে দেখা করতে গিয়েছিলো। নিজের কাছে টাকা ছিলো না। তাই একটি মোবাইলের দোকান থেকে ১০০ টাকা ধার করে মেয়ের জন্য বিস্কুট, চিপস নিয়ে গিয়েছিলো। নিহত সিরাজ রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। চারভাই ও তিন বোনের মধ্যে সিরাজ বড়। জন্মের পর থেকেই সিরাজ কথা বলতে পারে না। পরে ১০ বছর আগে একই এলাকার শামসুন্নাহারের সঙ্গে সিরাজের বিয়ে হয়। গ্রামে কাজ না পাওয়ায় ২০১৫ সালে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে আসেন তিনি। সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলোগেইট এলাকায় মোহর চানের বাড়িতে ভাড়ায় পরিবার নিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন সিরাজ। নিজে কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী আবার কখনো দিনমজুর হিসেবেই কাজ করতেন। আর স্ত্রী শামসুন্নাহার বাসাবাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। আটমাস আগে স্থানীয় বিদ্যুৎমিস্ত্রি আব্দুল মান্নান ওরফে সোহেলের সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে একমাত্র মেয়ে মিনজুকে নিয়ে পালিয়ে যান শামসুন্নাহার। পাঁচ মাস আগে সিরাজকে তালাকের চিঠি পাঠায় তার স্ত্রী। বোবা হলেও ইশারায় সব কথা বলতে পারতো। মোখলেসের মোবাইলের দোকান থেকে টাকা নেওয়ার সময় নিজেই হাতের ইশারা বুঝিয়েছে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। মেয়েকে দেখতে যাবে তাই অনেক খুশি ছিলো সিরাজ। ছেলেধরার অভিযোগ এনে মারতে মারতে সিরাজকে মাটিতে শুয়েই ফেলেছে উৎসুক মানুষ। মাটিতে যখন সে ছটফট করছিলো তখন কয়েকজন যুবক প্রাণটা যায় না কেনো তাই একের পর এক লাথি মেরেই চলেছে। মরে যাওয়ার পর লাশটা টেনে হেঁচড়ে প্রায় ১০০ গজ দূরে ফেলে রাখে।

এতো গেলো সিরাজ ও রানুর ঘটনা। একজন স্বামীর সাথে বিচ্ছেদ হয়েছে অন্য জন স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ। আবার কোথাও মাদকাসক্ত যুবক, কোথাও ভবঘুরে ভিক্ষুক এর সাথে ঘটছে ঘটনা। কোথাও কিন্তু ছেলে ধরা বা কল্লা কেটে সেতুর নিচে দেয়ার অভিযোগ প্রমানিত নয়। প্রতিটি ঘটনায়ই সন্দেহজনক। হয়তোবা নিজেদের মধ্যে কেউ উসকে দিচ্ছে, অথবা প্রতিশোধপরায়ন হয়ে বা অতি উৎসাহী হয়ে বা অন্য কোন উদ্দেশ্যে ঘটনা ঘটাচ্ছে। বিষয়টা পুলিশ বিষদভাবে খতিয়ে দেখলে প্রকৃত রহস্য উঠে আসবে। ততদিনে ঝড়ে যাবে কিছু প্রাণ, বুক খালি হবে কিছু মায়ের, পিতা-মাতা হারা হবেন কিছু সন্তান।   

বাস্তবতা বলছে, আইনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা, গুজবে হুজুকে জনতার কান দেয়া এবং মানুষের নৈতিক-সামাজিক অবক্ষয় থেকে মানুষ হয়েও জীবিত আরেকজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার মতো জঘন্য কাজ করতে পারছে। এ ধরনের হত্যার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করতে না পারার সুযোগটি কাজে লাগায় অপরাধপ্রবণ একদল মানুষরূপি জানোয়ার। কিন্তু যারা এধরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে তারা হয়তো চিন্তাও করতে পারছে না তারা কত বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। গণপিটুনির ঘটনা একটি ফৌজদারী অপরাধ। দন্ডবিধি ১৮৬০ এর বিভিন্ন ধারায় এ অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। দন্ডবিধিতে গণপিটুনির বিষয়ে বিস্তারিত হয়তো সংগায়িত করা নেই। কারন, হয়তো আইন প্রণয়নের সময় এজাতীয় অপরাধ সমাজে ছিলো না বা মানুষ এমন ঘটনা ঘটানোর কথা ভাবতেও পারত না। আইনবিদদের মতে গনপিটুনিতে মারা গেলে দন্ডবিধি১৮৬০ এর ৩০৪ ধারায় শাস্তি প্রদান করার সুযোগ রয়েছে। আর মারা না গেলে আঘাত বা জখমের ধরন অনুযায়ী দন্ডবিধির ১৪১-১৪৮, ২৬৮ ধারায়ও শাস্তির বিধান রয়েছে।

যে কোনো গুজবে কান দিয়ে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যা বন্ধ করা উচিত। কাজটা করতে হবে সরকারকে এবং আমাদের উচিত সরকারকে সহযোগিতা করা। অতি উৎসাহী হয়ে গুজবে কান দিয়ে গণপিটুনিতে অংশ নিয়ে অপরাধীর খাতায় নাম লিখানো উচিত হবে না। নিজেকে হিরো প্রমান করতে গিয়ে আসামীর খাতায় কেউ নাম লিখাবেন না। আপনার হিরোগিরি ভিডিও হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। সেই ভিডিও দেখেই পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। গুজবে কান না দিয়ে এ পরিস্থিতি দমনের জন্য সচেতনতা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। অপরিচিত কোনো নারী-পুরুষকে কোনো কারণে সন্দেহজনক মনে হলে তাকে আটকে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দেয়াই সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব। অবিলম্বে এ বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই। নতুবা এটা মহামারির চেয়েও ভয়াবহ আকার ধারন করবে, তখন আপনি আমি কেউই আর নিরাপদ থাকবো না। অতি উৎসাহীদের নির্মমতায় মা হারা তুবাকে কি জবাব দিবো সমাজ, বাক প্রতিবন্ধী বাবা হারা মিনজুকেই বা কি জবাব দিবে সমাজ? তুবার চোখের দিকে তাকানো যায় না, প্রতিটি তুবার চোখের ভাষা একই। আমাদের ক্ষমা করিস মা। এ সমাজ তোদের মা-বাবাকে হত্যা করেছে। 

Saturday, July 20, 2019

বিচারকের খাসকামরায় খুন। বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না


১৫ জুলাই ২০১৯ বেলা ১১টায় দেশে ঘটে যায় এক কলঙ্কজন ঘটনা। ঘটনাটি আর কিছুই নয়, আদালতের বিচার কক্ষে এবং বিচারকের কক্ষে (খাসকামরায়) ঘটেযায় হত্যাকান্ডের মত ঘটনা। সিনেমার ঘটনার মত ডায়লগ দিতে দিতে বিচার কক্ষের আসামী হাজিরার ডক থেকে কোপাতে কোপাতে খাসকামরায় গিয়ে কোপানো শেষ হয়। আদালতে বিচার প্রার্থী বিচারকের কক্ষেই উপর্যুপরি কোপে গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান এক আসামী। ঘাতক অপর আসামী তখন ডায়লগ দিচ্ছিলো-‘তোর কারণে মামলা খাইছি’। কি বিভৎস্য ঘটনা ভাবাযায়? ঘটনার পর পরই ঘাতককে গ্রেফতার, তদন্ত কমিটি গঠন এবং এমন অনাকাঙ্খিত ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা এবং নিরাপত্তা জোরদারের বিষিয়টি সামনে চলে এসেছে। হাস্যকর মনে হলেও নিরাপত্তার জন্য সেই পুলিশ কর্মীরাই থাকবে এবং সেটাই স্বাভাবিক। বিচার বিভাগ যদি একটি পাখি হয় তবে তার দুইটি ডানার মধ্যে একটি হলো বিজ্ঞ বিচারক অন্যটি আইনজীবী। একটি ডানা যদি ভেঙ্গে যায় বা ক্ষতিগ্রস্থ হয় সেক্ষেত্রে পাখিটি যেমন উড়তে পারে না। তবে একটি পাখির শুধু দুইটি ডানা থাকলেই হয় না, এর মজবুত পা থাকতে হয়, শক্ত ঠোট থাকতে হয়, থাকতে হয় পালকও। সব মিলিয়েই পাখিটির সৌন্দর্য ও কর্মক্ষমতা প্রকাশ পায়। বিজ্ঞ বিচারক আর আইনজীবী যদি পাখির দুটি ডানা হয় তবে আদালতে কর্মরত কর্মীরা হলেন কেউ পা, কেউ ঠোট, কেউ পালক।

আদালত পাড়ার ঘটনা নিয়ে মাঝে মাঝেই আলোচনার ঝড় ওঠে। কখনো আইনজীবীদের দোষ দেয়া হয়, কখনো বিজ্ঞ বিচারকদের দোষ খুজে বেড়াই। কিন্তু কেউ কি অন্য অঙ্গগুলোর খোজ রাখি? আদালতে পেশকার, সেরেস্তাদার, জারিকারক, পিয়ন থেকে শুরু করে আরো নানান শ্রেণীর লোক কাজ করে। সেই সাথে আদালতে নিরাপত্তার জন্য কাজ করে আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। সকলে যদি আন্তরিকতা, নিষ্ঠার সাথে সমান্তরাল গতিতে কাজ না করে তাহলেতো দুর্ঘটনা ঘটবেই।

সারা দেশে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির সাথে সাথে আদালত পাড়ায় আগত বিচার প্রার্থীদেরও ব্যয় বেড়ে গেছে। আগে শুনেছি বিচারপ্রার্থীরা তার নিয়োজিত আইনজীবীকে বিশ টাকাও বায়না দিতেন। পূর্বে হয়তো আরো কম ছিলো। এখন বায়না বেড়ে দাড়িয়েছে পাঁচশত টাকায় ক্ষেত্র বিষেশ আরো বেশি। বিচার প্রার্থীদের ব্যয় বৃদ্ধির কারন আইনজীবীদের উচ্চাভিলাশী চিন্তা নয়। প্রকৃত খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় এমনটা হয়েছে। আদালতের কর্মচারীদের স্পিড মাটি দিতে হয়। নয়তো দরখাস্ত থাকে না, নথী থাকে না বা পাওয়া যায় না। নকলখানায় গেলে কোন নথীই পাওয়া যায় না টাকা ছাড়া, জারিকারকরা মামলার রায় পর্যন্ত বিক্রি করে আসে। মোটা অংকের উৎকোচ না দিলে দিনের পর দিন সমন জারি হয় না এমন অভিযোগ হরহামেশাই শোনা যায়। কর্মচারীদের আচরন দেখলে মনে হয়, আইনজীবীরা কাড়ি কাড়ি টাকা নেয়, তাদের কেন দেবে না। তাইতো মানুষের মুখে মুখে-কোর্ট কাচারির দুর্বা ঘাসও নাকি টাকা চায়! এই অভিযোগটা কিন্তু গোপন নয়। প্রকাশ্য হলেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কখনোই নজর দেয় না। আর দেবেই বা কিভাবে? একজন কর্মচারী যদি প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করে নিয়োগ লাভ করে থাকে তবে সেতো সেই টাকা উঠানোর জন্য শুধু বেতনের দিকে তাকিয়ে থাকবে না বা তাকিয়ে থাকলে হবেও না। চাকরিটায় লাভ শুধু পেনশনে। সারা জীবনের বেতনের টাকা একবারে ঢেলে নিয়োগ পেয়েছে, সংসার চালায় স্পিড মানি দিয়ে, শেষ জীবনের ভরসা পেনশনের টাকাটাই, এমনটা ভেবেই তাদের চরিত্র নষ্ট হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন!

একসময় বাদশারা ছদ্মবেশে বের হতেন। অন্য কোন করনে নয়, দেখতে কেমন চলছে তার রাজ্য, বাদশা সম্পর্কে প্রজাদের মনোভাব কেমন। ছদ্মবেশে বের হয়ে দেখতো দেশে কিভাবে বিচার চলছে, শাসন চলছে, অনিয়ম হচ্ছে। নিজ চোখে দেখে বিচার করতেন বাদশারা। বর্তমান সময়ে কর্তাব্যক্তিদের উচিত মাঝে মাঝে তার অধস্তন কর্মচারীদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সঠিক কিনা খোজ নেয়া। শুধু অভিযোগপত্র পেলেই ব্যবস্থা নেয়া যাবে এমনটা ভাবা ঠিক নয়। নিজে যদি সৎ এবং সঠিক হন তবে অধস্তন ব্যক্তিদের উপরও নজর দেয়া উচিত। দুই চারটা সমন জারির খবর নেন গোপনে বা প্রতিদিনের বিভিন্ন দরখাস্ত জমা দেয়ার সময় নিজের লোক দিয়ে জমা দিয়ে দেখেন পেশকার কি করে, বা নকল প্রাপ্তির জন্য একটু নকলখানায় দূত পাঠান বা জামিন শেষে খোজ নেন পুলিশ কি করে তবেই পেয়ে যাবেন প্রকৃত চিত্র। নিজে ভালো হলেই তো হবে না, পরিবেশ ভালো করতে হবে নিজে ভালো থাকার জন্য। একটু নজর দিলে আদালত পাড়ায় দালালি, ঘুষ লেনদেন, অনিয়ম, বকসিস বাণিজ্য সব ঠিক হয়ে যাবে। 

আদালতের নিরাপত্তার কথায় আসি। প্রতিটি আদালতের প্রতিটি এজলাসের সামনে-ভিতরে পুলিশ দায়িত্বে থাকে। তারা শুধু শৃঙ্খলাই রক্ষা করে না, এজলাসে উপস্থিত সকলের নিরাপত্তার জন্যও থাকে। কিন্তু যারা আদালতে যান বা যাতায়াত আছে তারা দেখবেন, পুলিশ কি করে? একটা জামিন হওয়ার সাথে সাথে পুলিশ জামিনপ্রাপ্ত আসামীর পিছু নেয় বকসিসের জন্য। কোন কোন পুলিশ আসামীর নিয়োজিত আইনজীবীর চেম্বার পর্যন্ত চলে আসে! নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলো কি হলো না তার থেকে বেশি নজর বকসিসের দিকে থাকলে যে কেউ ছুরি-কাচি নিয়ে প্রবেশ করতেই পারে! একজন আসামী যখন কোর্টে ওঠে তখন নূন্যতম তল্লাশিটাও করে না। যে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে গেলো সেই ঘটনা কোন বিজ্ঞ বিচারক বা আইনজীবী বা বিচার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাথেও ঘটতে পারতো। বিশেষ করে আইনজীবীর সাথেও ঘটতে পারতো। ঘাতকের ধারনা নিহত ব্যক্তির কারনেই সে আসামী শ্রেণীভূক্ত হয়েছে! যে মামলায় আসামী হয়েছে সেই মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবীর শুনানী শুনেতো তার মনে হতে পারে যে ঐ আইনজীর কারনেই সে জেলে গেছে! তাই অনাকাঙ্খিত ঘটনা যাদের কারনে ঘটেছে তাদের কর্মকান্ড এখন আর অনাকাঙ্খিত নয়। তারা এমনটাই করে থাকে। তবে সবাই যে করে এমনটি যেমন ঠিক নয়, আবার সবসময় অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে এটাও ঠিক নয়। যখন ঘটে তখন সবাই নড়েচড়ে বসে। সবসময় সতর্ক থাকলে এমনটা ঘটতো বলে মনে হয় না।

আদালত পাড়ায় হত্যার ঘটনা আগেও ঘটেছে। এর আগে আদালত, বিচারক এবং আইনজীবীদের ওপর জঙ্গি সন্ত্রাসীদের হামলার ঘটনা ঘটেছে যা সবার মনে আছে। এসব ঘটনায় বিচারক-আইনজীবীসহ কয়েকজন নিহতও হয়েছেন। এরপর থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার দাবি উঠেছিল। এবার এই ঘটনা জনগণকে আবারও শঙ্কিত করে তুলেছে। একেকটা ঘটনা ঘটার পরে আমরা শঙ্কিত হই। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবশ্যই সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিচারসংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। ছাড় দিলে বার বার আমাদের শঙ্কিতই হতে হবে।

বিচার প্রার্থীদের সুবিচার দিতে হলে আদালতের পরিবেশ ঠিক করা জরুরী। যার যার দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করার দিকে নজর দেয়া উচিত। আদালতের ভিতরে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেটা আদালতের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তির নজর থাকতে হবে। কঠোর ভাবে যদি যার যার দায়িত্ব পালনে বাধ্য করা যায় তবে বিচার প্রার্থীরা সুবিচার পাবে এবং অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটবে না বলেই আমাদের মনে হয়।

Tuesday, July 9, 2019

বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা ॥ লাগাম টানতে হবে এখনই

পত্রিকায় খবর আসে টিভি নিউজের পরে। পত্রিকা পড়ার আগেই আমরা টিভি নিউজে ঘটনার আদ্যোপান্ত জেনে যাই। টিভি চ্যানেলগুলো এখন ঘটনা ঘটার সাথে সাথে তথ্য উপাত্ত প্রচারতো করেই সেই সাথে লাইভ টেলিকাস্ট করে ঘটনার পরিবেশ প্রতিবেশ জানিয়ে দেয় দর্শকদের। টিভি চ্যানেলের চেয়ে একধাপ এগিয়ে আছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। ফেসবুক এমন পর্যায়ে পৌছে গেছে কিছু বিষয় এখন লাইভও দেখাতে পারে এক্টিভিস্টরা। ফেসবুক একটিভিস্টরা ক্ষেত্র বিশেষ হত্যা, ধর্ষণও লাইভ দেখানোর ক্ষমতা রাখে, দেখায় না শুধু সামাজিকতা বা আইনের ভয়ে। তবে ফেসবুকের উপর অনেকসময় নির্ভর করা কঠিন। দল বিবেচনায় বা পক্ষ বিবেচনায় এক্টিভিস্টরা তাদের পছন্দ মত তথ্য প্রচার করে। কোন কোন সময় ফেসবুক এক্টিভিস্টরা মিথ্যা তথ্যও প্রচার করে আমাদের বিভ্রান্ত করে। এডিট করা ছবি, ভিন দেশের ভিডিও ফুটেজ নিজ দেশের সাম্প্রতিক ঘটনা বলে প্রচার চালিয়ে ভাইরাল করতে চেষ্টা করে। তাই ফেসবুকে কোন খবর, ছবি, ভিডিও ফুটেজ দেখার সাথে সাথে নির্ভরযোগ্য অনলাইন পোর্টাল বা পত্রিকার অনলাইন ভার্সন ঘেটে নিশ্চিত হয়ে নেই যে আসলে প্রচারিত তথ্য সঠিক আছে কী না! কর্মব্যস্ততার কারনে অনেকেরই টিভি দেখার সুযোগ হয় কম। তবুও সকালে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলালে হৃদযন্ত্র কেপে ওঠে। প্রতিদিন এক বা একাধিক হত্যা, ধর্ষণ, ধর্ষণ শেষে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, সড়ক দূর্ঘটনা, দুর্নীতি, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতিসহ নানান অপকর্মের সংবাদ নজরে আসলে কার হৃদয় না কাপে বলেন? যত শক্ত হৃদয়ই হোক না কেন কাপ দেবেই। বুড়া-মধ্যম-গুরা সবাই অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। এসব ঘটনা এমন পর্যায়ে পৌছে গেছে যে লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু লাগামটা টানতে হবে।  
দেশে দিন দিন ধর্ষণের নজিরবিহীন রেকর্ড হচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ১০০ দিনের একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। এটা উন্নয়নের কোন পরিসংখ্যান নয়, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণের পরিসংখ্যান! ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনে নজিরবিহীন রেকর্ড হতে চলেছে দেশে। হঠাৎ যেন মানুষের পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। একের পর এক ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটলেও কোনোভাবেই যেন এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। বিকৃত রুচির একশ্রেণির মানুষের বিকৃতি থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোমলমতি শিশুরা এমনকি বৃদ্ধরাও। ঘরে-বাইরে সর্বত্রই নারী ও শিশুর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠছে। বিরূপ প্রভাব পড়ছে সামাজিক জীবনে। চলতি বছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসে ৩৯৬ জন নারী-শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। খোদ পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমনের মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৩৯টি এবং হত্যা মামলা হয়েছে ৩৫১টি। বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনে সারা দেশে ৪৭ শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। ৪৭ শিশুর মধ্যে ধর্ষণের শিকার ৩৯ জন। শিশু ধর্ষণের ঘটনায় শিশুর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৬৪ জন শিশু। এ সংখ্যা জানুয়ারিতে ছিল ৫২, ফেব্রুয়ারিতে বেড়ে হয় ৬০ এবং মার্চে ফের ৫২ জনে দাঁড়ায়। তিন মাসে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৯ জন। এর মধ্যে ৭ জন প্রতিবন্ধী শিশুও ধর্ষণের শিকার হয়। ধর্ষণচেষ্টা হয়েছে ৮ জনের ওপর। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১২ জনকে। এ ছাড়া অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে ১১ জনকে। শারীরিক নির্যাতনের শিকার ১৬ জন। ২০১৮ সালে প্রতিদিন গড়ে ১৩ শিশু নির্যাতন, দুই শিশু ধর্ষণ এবং এক শিশু হত্যার শিকার হতো। ২০১৭ সালের চেয়ে ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণ-গণধর্ষণ বেড়েছে অন্তত ৩৪ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, এর বাইরেও বহু অপরাধের ঘটনা নিত্যদিনই ঘটে। সেসব ঘটনা রেকর্ডহীন বলে স্থান পায় না থানার হিসাবে। চাইল্ড পার্লামেন্টের নিজস্ব জরিপে এসেছে- গত বছর ৮৭ শতাংশ শিশুই কোনো না কোনো যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গণপরিবহনেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫৩ শতাংশ। কর্মজীবী ও গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। শিশুদের আত্মহত্যা করার প্রবণতা বেড়েছে ৩৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। ২০১৮ সালে ২৯৮ শিশু আত্মহত্যা করে, ২০১৭ সালে এ সংখ্যাটি ছিল ২১৩। অপরাধের এই যে উর্ধ্বমুখী সূচক এ সূচক আমরা চাই না। 
এতো গেলো ধর্ষণ-নারী ও শিশু নির্যাতনের কিছু পরিসংখ্যান। এর বাইরেও সংঘটিত হচ্ছে হত্যা, জখম, গুম, অপহরণ, মাদক সংশ্লিষ্ট নানান অপরাধ। প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে কুপিয়ে, পিটিয়ে, গুলি করে মানুষ মারছে সন্ত্রাসীরা। কোন কোন ঘটনা এতটাই বিভৎস্য যা দেখা যায়না বা পড়াও যায় না। দুর্বল চিত্তের মানুষ সেসব ঘটনা পড়লে অসুস্থ হয়ে পরে। ধর্ষণের ঘটনাগুলো পড়লে গা শিউরে উঠে। কলা বাগানে নিয়ে, ধান ক্ষেতে নিয়ে, পাট ক্ষেতে নিয়ে, ছাদে নিয়ে, চলন্ত বাসে ধর্ষণের বর্ণনা পাওয়া যায়। শিশু থেকে শুরু করে এক পা কবরে এমন বৃদ্ধাকেও ধর্ষণের স্বীকার হতে হচ্ছে। যুবতী বা মধ্য বয়সী হলেতো কথাই নেই। বাবার কাছে কন্যাও নিরাপদ থাকছে না, শশুরের কাছে পুত্র বধু, শিক্ষকের কাছে ছাত্রী, আত্মীয়র কাছে আত্মীয় এমনকি মসজিদের ইমামদের কাছেও অনিরাপদ হয়ে উঠছে নারী-শিশু-ছাত্রীরা। আমরা কি এমন দেশ চেয়েছি না চাই? মানুষ একটু স্বাভাবিক ভাবে যদি বাঁচতেই না পারে তবে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এ স্বাধীনতার কি মূল্য আছে?
সমাজে এখন এক নিদারুন অস্থিরতা বিরাজ করছে। কারো প্রতি কারো শ্রদ্ধাবোধ নেই, ভালোবাসা নেই, মমত্ববোধ নেই, আন্তরিকতা নেই, শুধু নেই নেই। দেশে বিচার নেই সে কথাতো বলা যাবে না। অঘটন ঘটাচ্ছে, আসামী গ্রেফতার হচ্ছে, বিচার হচ্ছে তবুও থামছে না। আবার একই রকম ঘটনায় প্রভাবশালীদের আত্মীয় হলে বেশি কোপাকুপি করেও হাজতে যায়, প্রভাব না থাকায় কম কুপিয়েও খরচের খাতায় চলে যায়! কেউ চুরির মামলায় আট মাসেও জামিন পায় না আবার কেউ ধর্ষণ করে আট দিনের মাথায় জামিনে মুক্তি নিয়ে ফুলের মালা গলায় দিয়ে বের হয়। এটাও কি সামাজিক অবক্ষয় বা অস্থিরতার কারন নয়?
এমন ঘটনা ঘটতেই থাকবে, যদি না লাগাম টানা হয়। আর লাগামটা টানতে হলে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো তৎপর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে হবে। আমাদের সমাজ বিজ্ঞানীদেরও অনেক ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে, হোক সেটা পরামর্শ দিয়ে। রাষ্ট্র যন্ত্রকে পরামর্শ শুনতে হবে। অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া বন্ধ করতে হবে এবং সেটা করার জন্য আমাদের রাজনীতিবীদদের ভূমিকা রাখতে হবে। একটা কথা এখন বেশ প্রচলিত হয়ে গেছে, সেটা হলো-আগে ছিলাম দারিদ্র সীমার নিচে আর এখন আছি চরিত্র সীমার নিচে। আমাদের পরিবারগুলোর অনেক ভূমিকা রাখা উচিত। সবকিছু রাষ্ট্রের উপর আর ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। প্রতিটি পরিবার থেকে সন্তানদের সামাজিক মূল্যবোধ শিক্ষা দিতে হবে। সন্তান কি করে, কোথায় যায়, কার সাথে চলে সেই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে। আর বড়দের বিষয়টা নাহয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপরই ছেড়ে দিন। পরিবার থেকে শিক্ষা নিতে পারলে বড় হয়ে আর খারাপ পথে যাবে না, তবে একেবারেই যে যাবে না সেই নিশ্চয়তা আমিতো দিতে পারবোই না এমনকি পরিবারও দিতে পারবে না। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সেবা দেয়ার ও সেবা নেয়ার, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকার মানসিকতা জাগ্রত করতে হবে। সর্বপরি একটা কথাই বলবো, আমরা এ পরিস্থিতির থেকে মুক্তি চাই, স্বাভাবিক ভাবে বাঁচতে ও মরতে চাই। একটা সুস্থ্য সমাজ চাই, যেখানে আপনার আমার সন্তান নিরাপদে বড় হবে। 

Monday, July 1, 2019

আমার ফুপি

আমার ফুপিরা অনেক ভালো
ঠিক যেন মেয়ে
কিসে আমার ভালো হবে
থাকে সেদিক চেয়ে।
আমায় অনেক আদর করে
অনেক ভালোবেসে
সবসময় কথা বলে
আমার সাথে হেসে।
মামমামও অনেক ভালো
আদর দেয় বেশি
ফুপি-মামমাম সবার সাথে
থাকি আমি খুশি।

ফুল ও ফুলী

শুঁকেছো কী তুমি কদমের ঘ্রাণ, কিংবা হিজল ফুল
গোছল শেষে যাওয়ার কালে, প্রিয়ার ভেজা চুল?
ছাতিম ফুলের মাতাল গন্ধ, অনুভব করেছো তুমি
প্রাণের চেয়েও হয় কতটা, প্রিয় মাতৃভূমি?
কৃষ্ণচুড়া কতটা রক্ত, ঢেলেছে তাহার ফুলে
দেখেছোকি কভু প্রিয়ার চলন, অর্ন্তদৃষ্টি খুলে?
সোনালূ গাছে কেমন করে, ঝুলছে থোকায় ফুল
আদর করে দিয়েছো কভু, প্রিয়ার কানে দুল?
জারুল ফুলের শোভা তুমি, দেখেছো কী কভু চেয়ে
তোমার জন্য ভালোবাসায়, প্রিয়ার মন গেছে ছেয়ে?
কামিনী ফুল কেমন করে, ফুটে আছে থোকা থোকা?
প্রিয়ার কোমল মনে কভু, দেয়া যাবে না ধোকা।
গন্ধরাজের গন্ধে মাতাল, ভ্রমর গুনগুনায়
প্রিয়া তোমার পথ পানে, কেন সদা চায়?
বেলি ফুলের শৌরভে, অলিরা গুনগুন করে
তোমার প্রিয়া তুমি বিহীন, কেমনে থাকে ঘরে?
রক্ত জবা ঠোটে কভু, আলতো ছোঁয়া দিয়ে
সফেদ সাদা মেঘের ভেলায়, ভেসেছো প্রিয়াকে নিয়ে?
বকুল ফুল কুড়িয়ে তুমি, দিয়েছো আজলা ভরে?
চাতকের মত চেয়ে আছে যে প্রিয়া তোমার ঘরে?
কচুরি ফুলের কোমন শোভা, প্রিয়ার গালের মত
তুমি বিহনে তার হৃদয়ে হয়েছে কত ক্ষত?
ফুলের শোভা নিও তুমি, প্রিয়ার পরশ নিও
দু’হাত বাড়িয়ে, বুকে টেনে নিয়ে একটু আদর দিও।