ভালবাসি প্রকৃতি

ভালবাসি প্রকৃতি

Saturday, March 30, 2019

জাজিরা থেকে কেন চলে যাচ্ছে উনিশশো কোটি টাকার তাঁতপল্লী? আশা হতাশার গল্প

শুরুতেই আশার গল্প, আষাঢ়ে গল্প নয়! বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে আমরা জানতে পারি, মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের জাজিরায় এক হাজার ৯১১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ হতে যাওয়া তাঁতপল্লী ঘিরে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন বিলুপ্তপ্রায় তাঁতিরা। এ প্রকল্পটির জন্য শিবচর উপজেলার কুতুবপুরে ৬০ একর ও শরীয়তপুরের জাজিরায় ৪৮ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। তাঁতপল্লীতে থাকবে কারখানা, আবাসন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণসহ আধুনিক সব সুবিধা। মিরপুরের বেনারসি পল্লীর তাঁতিরাও এ পল্লীর অর্ন্তভূক্ত হবেন। প্রধানমন্ত্রী ১ নভেম্বর এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পদ্মা সেতুর দ্রুত বাস্তবায়নের সঙ্গে এ এলাকায় তাঁতপল্লী স্থাপনের কাজ শুরু হওয়ায় নতুন করে স্বপ্ন দেখছেন এ অঞ্চলের তাঁতিরা। ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাঁতপল্লীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও জায়গা নির্ধারণ হয়েছে আরও আগেই। দুই মাসের মধ্যে শুরু হবে মাটি ভরাটের কাজ। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৫৩ কোটি টাকা। এতে ৬ তলা বিশিষ্ট ভবনগুলোতে প্রত্যেক তাঁতির জন্য ৬০০ ফুটের কারখানা ও ৮০০ ফুটের মধ্যে আবাসন সুবিধা থাকবে। সরকারের পক্ষ থেকে সুতা-রঙসহ কাঁচামালের সুবিধা দেওয়া হবে। নির্মাণ হবে আর্ন্তজাতিক মানের শোরুম ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। তাঁতিদের ছেলেমেয়েদের জন্য থাকবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রী এই পদ্মাপাড়ে তাঁতপল্লী গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নিয়েছেন তাতে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবার পুনরুজ্জীবিত হয়ে উঠবে। এখানে সয়েল টেস্ট শেষে বিভিন্ন ভবন নির্মাণ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ২৫৩ কোটি টাকার কাজ শেষ করব। মূল প্রকল্প ১ হাজার ৯১১ কোটি টাকার। এটি একটি মেগা প্রকল্প। এখানে ঢাকার মিরপুরের বেনারসি পল্লীর তাঁতি ও এই অঞ্চলের তাঁতিদের পুনর্বাসন করা হবে। তাদের প্রত্যকের জন্য আধুনিক অনেক ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। তাঁতিদের বিনামূল্যে অথবা ন্যায্যমূল্যে সুতা, রঙসহ বিভিন্ন কাঁচামাল সরবরাহ করা হবে। রঙ করা, ফ্যাশন ডিজাইনসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

এবার শুনাই হতাশার গল্প। অনিয়ম রোধে মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের জাজিরায় ১৯শ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হতে যাওয়া শেখ হাসিনা তাঁতপল্লীর পূর্ব নির্ধারিত স্থান পরিবর্তন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী। প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনকালে একথা বলেন তিনি। এ সময় চিফ হুইপ বলেন, শেখ হাসিনা তাঁতপল্লীর নির্ধারিত স্থানে অবৈধ স্থাপনা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে দেখা গেছে এখানে ভালো কিছু হচ্ছে না। আমাদের নির্দেশনায় মাদারীপুরের প্রশাসন অবৈধ সব স্থাপনা ভেঙে ফেলেছে। কিন্তু শরীয়তপুরের প্রশাসন কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করেনি। গত ২৪ মার্চ পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর্জা আজম, সংলগ্ন সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা সবাই একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেসব এলাকায় অবৈধভাবে ঘরবাড়ি, গাছপালাসহ স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে সেসব এলাকা এই প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হবে। তিনি বলেন, দুই জেলায় এমন একটি প্রকল্প করতে গেলে শুধু এই অনিয়মই নয় ভবিষ্যতে আরও কিছু সমস্যা হবে। তাই সংসদীয় কমিটি, মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সবাই একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী একই উপজেলায় করা হবে। আর এ জন্য মাদারীপুরের শিবচরের কুতুবপুর এলাকায় জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই যে আশা হতাশা কাদের জন্য? তাদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেবে সরকার? প্রশাসনের যে কর্তাব্যক্তিদের কারনে ও প্রশ্রয়ে অনিয়ম ঘটলো সেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে কি? যে জনগন এ অনিয়ম ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হবে কি? এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরছে মনে। শুধু আমার নয়, সারা শরীয়তপুরবাসীর মনে এমন প্রশ্ন। অনিয়মের অভিযোগে মুখ ফিরিয়ে নিলেই কি দায় শেষ হয়ে যাবে। যদি কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় তবে ভবিষ্যতেও এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখবে কুলাঙ্গাররা। এখানে তাঁতপল্লী হোক বা না হোক অনিয়মের যে অভিযোগ উঠেছে তার তদন্ত যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে করে উপযুক্ত বিচারের আওতায় আনা উচিত। পূর্বের অনিয়মের বিচার হলে আজকে অপবাদ মাথায় দিয়ে তাঁতপল্লী সরিয়ে নেয়া সম্ভব হতো না। 

জাজিরায় পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকরা, দালালরা, প্রশাসনের কর্তারা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে সেই খবর আজ বাসি-পঁচা। এর পর সেনানিবাস তৈরীর জন্য যখন জমি প্রয়োজন হলো তখন সেই এলাকার জমির মালিক, দালাল, প্রশাসন আবার এক হলো। হাজার হাজার গাছের চারা রোপন করে, যেনতেন ভাবে ঘর তৈরী করে, পুকুর খনন করে ফাঁদ পাতলো টাকার জন্য। পাট কাঠির মত গাছের চারা আধা ফুট অন্তর অন্তর রোপন করেছিলো। সেই গাছের জন্য এবং জমি ও ঘরের জন্য ছাব্বিশ কোটির অধিক টাকার বিল তৈরী করেছিলো প্রশাসনের সহায়তায়। অতপর মিডিয়া কর্মীদের কারনে পাঁচজন বন কর্মকর্তার সম্বয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করলে ১৫ কোটি ২৯ লাখ টাকা কমে গিয়েছিলো। সুযোগ সন্ধানীরা আবার রিট করে সেই টাকা তুলে নিয়েছে। প্রশাসন তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে টাকা প্রদান আটকাতে আগ্রহী না হলেও রিটের কারনে টাকা দিতে বেশি আগ্রহী ছিলো। প্রশাসন আদালতকে যথাযথ ভাবে বুঝাতেই পারেনি না বুঝাতে চেষ্টা করেনি সেটাই প্রশ্ন। আর চেষ্টা করবেই বা কেন, টাকা কমলে কমিশনও কমে যাবে সেটা পাগলেও বুঝে। 

এর পরই ঘোষণা আসলো তাঁতপল্লীর। আবারও সেই ঘটনার পূনরাবৃত্তি। স্থানীয় লোকজন, দালালরা, প্রশাসনেরও অনেক লোক জায়গা কিনে, ভাড়া নিয়ে গাছ লাগালো, ঘর তুললো, পুকুর খনন করলো। বিচি বুনলে যেভাবে গাছের চারা হয় ঠিক সেভাবেই লাগানো হলো গাছের চারা। দুর থেকে দেখলে মনে হবে সবজির বাগান! কারন আর কিছুই নয়। একেকটা চারা কিনে আর লাগাতে খরচ হবে দশ থেকে পনের টাকা আর বিল পাবে দশ থেকে বিশ হাজার টাকা। এমন টাকার গাছ কেউ কি না লাগিয়ে পারে? ঘর তুলেছে দোচালা, সেই ঘর হয়ে যাবে কাগজে কলমে দোতলা। এমন আয়ের পথে কে না হাটে? পুকুরে পানি আর মাছতো দুরের কথা মাটিও নেই, শুধুই বালু আর বালু। সেই পুকুরের, মাছের, এমনকি পানিরও বিল হবে! একেই মনে হয় বলে পুকুর চুরি! এই যে কাজগুলোর কথা বললাম, এগুলো কারা করে? আমার দেশের চাষা ভূষা, খেটে খাওয়া মানুষ এসব কুটকৌশল জানেন না। শিক্ষিত ব্যক্তি, চতুর, দুর্নীতিবাজরাই এসব করতে জানে এবং করেছেও। দুর্নীতিবাজরা অতীত থেকে ঠিকই শিক্ষা নিয়েছে। কে বলেছে এ জাতি অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না? অতীতে তারা দোচালা ঘরকে দোতলা, দুই মাস বয়সী গাছের চারাকে বিশাল বৃক্ষ, বালু ভর্তি পুকুরে মাছের সমারহ দেখি বিল করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। সেই অতীত তারা ভুলে যায়নি। 

অনিয়মের অভিযোগ আর দুই জেলায় প্রকল্প হলে ভবিষ্যতেও সমস্যা হবে এমন অভিযোগ এনেছেন চিপ হুইফ মহোদয়। আসলে তার এ অভিযোগ কতটুকু যুক্তিযুক্ত? দুই জেলায় হবে প্রকল্প, দুই দেশেতো নয়। একই দেশের দুটি বা তিনটি জেলার জমিতে কোন প্রকল্প হলে সমস্যা কি? যদি সমস্যাই হতো তবে কেন শুরুতেই দুই জেলায় প্রকল্পের পরিকল্পনা করেছিলেন পরিকল্পনাবিদরা? আসলে আমাদের বঞ্চিত করার অযুহাত দরকার। অনিয়মের অযুহাতের সাথে যোগ করেছেন দুই জেলার কথা এর বাইরে কিছুই নয়। 

জাজিরার মানুষ আজ কোটিপতি। এটা খুবই আনন্দের বিষয়। বাস্তবে কতজন ব্যক্তি নিয়মতান্ত্রিকভাবে কোটিপতি হয়েছেন? কতজনকে সরকার কোটি টাকার চেক দিয়েছেন সেটা খতিয়ে দেখা উচিত। বেশিরভাগ মানুষই কোটিপতি হয়েছেন অনিয়মের মাধ্যমে, দালালির মাধ্যমে। যারা অনিয়মের মাধ্যমে কোটিপতি হয়েছেন তাদের বিষয়ে খোজ খবর নেয়া উচিত রাজস্ব বিভাগের। সেই সাথে দুদকের ভূমিকাও এড়িয়ে যাওয়ার মত নয়। একটু খোজ খবর নিলে অনেক দালালই বেরিয়ে আসবে জাতির সামনে। একটু খুজুন, একটু ধরুন। 

জাজিরায় তাঁতপল্লী হলে এ অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ উপকৃত হত। আর দুর্নীতির কানে কয়েকশ মানুষ হয়তো লাভবান হতো। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতো। এখানে নানান রকম ব্যবসা বাণিজ্য গড়ে উঠতো। মানুষ কাজ করে খাওয়ার সুযোগ পেতো। অতি লোভের কারনে সব বন্ধ হয়ে গেলো। যারা অতি লোভে এমন কাজগুলো করেছে তাদের খুব বেশি ক্ষতি হবে না। তাদের হয়তো লাভটা হবে না কিন্তু ক্ষতিগ্রস্থ হবে এলাকার মানুষ। একটি সমৃদ্ধ শরীয়তপুর হতে পারতো। কয়েকশ লোভী মানুষের কারনে ক্ষতিগ্রস্থ হলো সাধারণ হাজার হাজার মানুষ, ক্ষতিগ্রস্থ হলো শরীয়তপুর জেলা। কিন্তু সারা দেশের মানুষ, সারা বিশ্বের মানুষ চিনে নিলো শরীয়তপুরের জাজিরার মানুষকে। সবাই জানবে, সবাই ভাববে জাজিরার মানুষ কত খারাপ, কত নিকৃষ্ট, কত দুর্নীতিপরায়ন, আত্মহননকারী। এর দায় থেকে কিভাবে এড়িয়ে যাবে জাজিরার মানুষ, শরীয়তপুরের প্রশাসন? প্রশ্নটা রেখেই গেলাম। উত্তর আমার জানা নেই, যদি কারো জানা থাকে তবে আমারই মত জানিয়ে দিন। জাজিরাবাসী দায়মোচন হতে পারবে হয়তো। 

ছবিঃ মুরাদ হোসেন মুন্সী ও গুগল।

Tuesday, March 12, 2019

এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারে শরীয়তপুর সরকারি কলেজ ॥ শিক্ষার্থী হিসাবে আমার কিছু স্মৃতি


শরীয়তপুর সরকারি কলেজ। দেখতে দেখতে চল্লিশ বছর হয়ে গেলো প্রাণের কলেজটির। দীর্ঘ সময়ে এ কলেজ আমাদের উপহার দিয়েছে অনেক শিক্ষাবিদ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, প্রজাতন্ত্রের সেবক, আইনজীবী, সমাজ সেবক, রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ব্যবসায়ী সহ কতই না ব্যক্তিত্ব। এই কলেজ থেকেই শিক্ষা নিয়ে স্বস্ব কর্মক্ষেত্রে নিজেকে নিয়োজিত করে সমৃদ্ধ করেছেন দেশকে এবং নিজেকেও। আগামী শুক্রবার চল্লিশ বৎসর পূর্তি উৎসবে মিলিত হবেন কলেজের সাবেক-বর্তমান শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীবৃন্দ। আসবেন দেশ বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা। সারাদিন চলবে আড্ডা, স্মৃতিচারণ, র‌্যালি, খাওয়া-দাওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রাণের সেই প্রিয় কলেজকে নিয়ে সকলের যেমন রয়েছে মধুর স্মৃতি, তেমনি আমারও রয়েছে। তারই কিছু কথা আজ তুলে ধরতে চাই।  
শরীয়তপুর সরকারি কলেজের যাত্রা শুরু সেই ৯ জুন ১৯৭৮ সাল থেকে। পরবর্তীতে ১ মার্চ, ১৯৮০ সালে কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়। কলেজটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই পশ্চাৎপদ শরীয়তপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীসহ আশ পাশের জেলার শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা লাভে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে। শরীয়তপুর সরকারি কলেজ শুধু শিক্ষাগ্রহণের উন্নত পরিবেশ তৈরীই নয় বরং কলেজটি শরীয়তপুর বাসির আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের কেন্দ্রস্থলে রূপান্তর করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। যার ধারাবাহিকতায় আমারমত হাজারো শিক্ষার্থী আজ শরীয়তপুর সরকারি কলেজ থেকে শিক্ষার আলো নিয়ে পথ চলছে।
প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর পর ১৯৯৪ সালে এসএসসি পাশ করে আমি শরীয়তপুর সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। একাদশ শ্রেণীতে ভর্তি হয়ে সান্নিধ্য পেয়েছিলাম পদার্থ বিদ্যার শিক্ষক বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক এম এ আজিজ মিয়া, রসায়ন বিদ্যার শিক্ষক শামসুল আলম খান, গণিত বিভাগের শিক্ষক কালিপদ স্যার, বাংলা বিভাগের শিক্ষক বর্তমান অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ মনোয়ার হোসেন, প্রাণী বিজ্ঞানের তোফাজ্জল হোসেন স্যারের মত গুণী শিক্ষকদের। খন্ডকালীন সময়ের জন্য আমাদের পদার্থ বিদ্যা পড়িয়েছেন শাহনাজ পারভীন আপা যাকে আমরা ভুলে যাইনি। যাদের স্নেহ, ভালোবাসা, শিক্ষা, উৎসাহ ও প্রদর্শিত পথ ধরে আজও হাটার চেষ্টা করছি আমরা। 
কলেজ জীবনের প্রথম একটা ঘটনা আজও হৃদয়ে গেথে আছে। ঘটনা আমার হৃদয়ে যতটা দাগ কেটেছে তারচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে বন্ধু মাহমুদুল হাসান মিলনের গালে। প্রধান সড়ক থেকে কলেজে প্রবেশের রাস্তার শেষ ভাগের ভবনের নিচ তলায় ছিলো আমাদের একটি শ্রেণীকক্ষ। ক্লাশের প্রথম দিনেই আমি, বন্ধু মাহমুদুল হাসান মিলন, মোল্লা আলিমুজ্জামান, শামীম আজিজ, সরদার আজিজুর রহমান রোকন, আনোয়ার হোসেন, সুশান্ত কুমার কংসবণিক সহ অন্য সহপাঠীরা বসেছিলাম জানালার কাছে। ভবনের সামনে ছিলো একটা খেজুর গাছ। হঠাৎ একটা মিছিল নিয়ে কিছু ছাত্র কলেজের ভিতরের দিকে যাওয়ার সময় আতংক সৃষ্টি করার জন্য খেজুর গাছ লক্ষ্য করে একটি ককটেল নিক্ষেপ করে। হাতের নিশানা ভালো না হওয়ায় ককটেল গিয়ে গাছের পরিবর্তে আঘাত করে ভবনের দেয়ালে। বিস্ফোরনের সাথে সাথে কিছু স্প্রিন্টার জানালা দিয়ে আঘাত করে মাহমুদুল হাসান মিলনের গালে। আজও সেই দাগ বয়ে বেরাচ্ছে মিলন। 
একদিন বাংলা পাঠদানের সময় ক্লাস নিচ্ছেন মোঃ মনোয়ার হোসেন স্যার। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার করছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ওপার বাংলায়। আলোচনার এক পর্যায়ে আমি অজ্ঞতা বসত পিছন থেকে বলেছিলাম ‘তাহলে কাজী নজরুল ইসলাম হলো আমাদের দেশের ধার করা কবি’। কথাটা স্যারের কানে যাওয়ার সাথে সাথে ভীষণ ক্ষেপেগিয়েছিলেন। কথাটা কে বলেছে সেটা নির্ধারণ করে আমাকে লজ্জা দিতে পারতেন। কিন্তু স্যার সেদিন তার উদারতা দিয়ে তা না করে বরং আলোচনার মাধ্যমেই সতর্ক করে দিয়েছিলেন। সেদিনের সেই অনাকাঙ্খিত কথাটা বলায় স্যার আমাকে সরাসরি লজ্জা না দিলেও মনে পড়লে এখনও আমি লজ্জাবোধ করি। 
কলেজ জীবনে সাইন্সের ছাত্র হিসাবে যদিও খুব বেশি অবসর সময় আমরা পেতাম না, তবুও যতটুকু সময় পেয়েছি তা কেটেছে জামরুল গাছের নিচে কংক্রিটের বেঞ্চে বসে, কখনো মাঠে খেলাধুলা করে। বেশিরভাগ সময়ই কাটতো আমাদের লাইব্রেরীতে, ল্যাবে অথবা ক্লাসরুমে। ছুটি পেলেই বেরিয়ে পড়তাম বাড়ির উদ্দেশ্যে। সাইন্সের ছাত্ররা রাজনীতি করার সময় ও সুযোগ পেত কম। কিন্তু ক্লাসে বসে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা কাজী নজরুল ইসলাম ভাইর দরাজ কন্ঠে স্লোগান, ভাষন আজও মনে আছে। আনন্দ ঘন সময় কাটতো বিজ্ঞান মেলায়, কলেজের বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতায়, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে আর বন্ধু-বান্ধবিদের সাথে গল্প করে। কলেজের বান্ধবী লাবনী লুবনা রাজ যদিও অল্প কয়েকদিন আমাদের কলেজে ছিলো, তবুও তাকে আমরা ভুলতে পারিনি। রিমা, সাম্মী রহমান, মেবিন, সুমি, রানু, তানিয়া, রিনা, নাজমা, সোনালী দেবনাথ, মানিক দেবনাথ, দীপক কুমার কংসবণিক, বশির, জ্ঞান প্রকাশ সহ সকল বন্ধুরা আজ শরীয়তপুর সরকারি কলেজের দেয়া সু-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন পদ অর্জন করে দেশের সেবা করে যাচ্ছে। সাইন্সের ছাত্র হলেও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের সাথে আমাদের ছিলো সমান হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। ল্যাব সহকারী মনসুর ভাই, খালেক ভাইদের সহযোগীতাও ভুলে যাওয়া মত নয়।
শরীয়তপুর সরকারি কলেজ এখন কতটা সমৃদ্ধ সেটা বলে বোঝানো যাবে না। কলেজে এখন বিভিন্ন বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পড়ছে। কলেজে হোস্টেল হয়েছে। দূর দূরান্ত থেকে আর বাই সাইকেল চালিয়ে বা লজিং থেকে পড়তে হয় না শিক্ষার্থীদের। একাধিক একাডেমিক ভবন হয়েছে। সেই চিরচেনা পরিবেশ আর নেই। বদলে গেছে কলেজের পরিবেশ। অনেকটা উন্নত হয়েছে যা প্রত্যাশা করতাম আমরা। 
দেখতে দেখতে চল্লিশ বছরের পুরনো প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে শরীয়তপুর সরকারি কলেজ। এই কলেজের অনেক শিক্ষার্থী আজ প্রফেসর, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, আইনজীবী, কবি, লেখক, সাংবাদিক, রাজনীতিক হয়ে স্বস্ব পেশায় কৃতিত্বের সাক্ষর রাখছেন, ভবিষ্যতে নানান শাখায় কৃতিত্বের পরিচয় দিবেন।
শরীয়তপুর সরকারি কলেজ শরীয়তপুর জেলাই নয়, আশ পাশের জেলাগুলোর শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে সমৃদ্ধ করে চলেছে। একসময় স্নাতক পর্যন্ত পড়ানো হতো, পর্যায় ক্রমে তা স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর শ্রেণী যুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে পদ্মা পাড়ের জেলা শরীয়তপুরের উপর দিয়ে তৈরী হচ্ছে দেশের সবচেয়ে মেগা প্রকল্প পদ্মা সেতু। পদ্মা সেতু কেবল দেশের দক্ষিণ আর পূর্বাঞ্চলের সেতুবন্ধনই হবে না, এই সেতু এশিয়ান হাইওয়ের রুট এর অংশ হিসেবেও ব্যবহার হবে। পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। পদ্মা সেতুর দুই তীরে হংকংয়ের আদলে শহর গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। এখানে একটা ভালো কনভেনশন সেন্টার করা হবে, বাণিজ্য মেলাটাও ঢাকা থেকে স্থানান্তরের পরিকল্পনা চলছে। ফলে এখানে বিনোদনের জন্য চমৎকার ব্যবস্থা হবে। পদ্মা তীর ঢাকার জিরো পয়েন্ট থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে। কাজেই পদ্মা পাড়ে নতুন একটা আলাদা শহর গড়ে তুলতে নানান পরিকল্পনা হাতে নিচ্ছে সরকার। পদ্মার এপাড়েই নতুন একটি বিমানবন্দর নির্মাণ করা হবে। অলিম্পিক ভিলেজ, তাত পল্লীসহ দেশের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে হংকংয়ের মতো শহর হবে শরীয়তপুরের পদ্মা পাড়।
শিক্ষায় সমৃদ্ধ হলেই একটি জেলা পরিপূর্ণরূপে সমৃদ্ধ হয়। ঢাকার উপর চাপ কমাতে হলে পশ্চাৎপদ শরীয়তপুর জেলায় একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখন সবার প্রাণের ও যৌক্তিক দাবী হতে পারে। শরীয়তপুর সরকারি কলেজ একদিন বিশ্ববিদ্যালয় হবে, এতদাঞ্চলের মানুষ উন্নত ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পাবে সেই প্রত্যাশা কলেজ প্রতিষ্ঠার চল্লিশ বছর পর আমরা করতেই পারি। সরকারের কাছে আমাদের দৃঢ় প্রত্যাশা, শরীয়তপুর সরকারি কলেজকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপান্তর করুক। রাজধানী ঢাকার উপর চাপ কমাতে এবং পশ্চাৎপদ জেলাটিকে একটি সমৃদ্ধ জেলা হিসাবে রূপদানের জন্য এর চেয়ে ভালো পদক্ষেপ হতে পারে বলে আমরা মনে করি না। 
লেখকঃ আইনজীবী ও কলামিস্ট, এইচএসসি ৯৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী। 

Friday, March 8, 2019

নারীর রূপ

নারী তুমি দাদি, তুমিই আবার মা
নারী তুমি বউ, তুমিই আবার জা
নারী তুমি ভগ্নি, তুমিই আবার প্রেয়সী
একেক রুপে তুমিই, হও যে শ্রেয়ী।

নাতনী যখন, দাদির সাথে কতই সখ্যতা
মা হও যখন, প্রতিপালনে দেখাও দক্ষতা
বউ হলে বিরুপ হও, শাশুরির সব কাজে
শাশুরির সব কথাই, লাগে আজে-বাজে।

মা হলে মেয়ে তোমার, কত সুন্দর সাজে!
শাশুরী হলে ভাবে বউ, কলিজাটা ভাজে
বোন যখন তখন তুমি, বোনকে ভাবো মিত্র
ননদকে দেখে ভাবো তুমি, আজন্ম এক শত্রু।

মেয়ের কথায় জামাই যদি, উঠে এবং বসে
কথাটা শোনার পরেই, মন খুশিতে হাসে
বউয়ের কথায় ছেলে যদি, কোন কর্ম করে
গা জ্বলে যায় সেটা শুনে, কষ্টে মন মরে।

অধম জুয়েল বলে, ভেবে নাহি পাই
বহুরূপ থেকে কি, নারীর মুক্তি নাই?
বদ চিন্তা থেকে যতদিন, বের হবে না নারী
মুক্তি হবেনা, পড়েই থাকবে, পরে বারোহাত শাড়ী।

বিঃদ্রঃ আমি নারী বিদ্বেষী নই। কথাগুলো যদি কোন নারীর খারাপ লাগে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইলো।

Friday, March 1, 2019

কিস্তি

রাতে ঘুম হচ্ছে না মকিমের। ঘুম আসবেই বা কি করে? হাতে একটাও টাকা নেই। টাকার চিন্তা বড় চিন্তা। মহিলাদের শক্তি তার স্বামী আর পুরুষ মানুষের স্বামী হলো টাকা। তাইতো টাকাকে সেকেন্ড গডও বলে কেউ কেউ।
মকিম অলস প্রকৃতির মানুষ। তার কাজ ভালো লাগে না। মকিমের বন্ধু জাবেদ একটা ছেচড়া চোর। সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির পাশের চায়ের টং দোকানের সামনে গিয়ে দাড়াতেই দেখা জাবেদের সাথে। জাবেদের ডাকেই মকিম এগিয়ে গেলো দোকানের দিকে। দোকানের সামনে বাশের খুটি আর বাশের চটি দিয়ে তৈরী বেঞ্চের উপর বসা জাবেদ। জাবেদের ডাকে সাড়া দিয়ে কাছে যেতেই বললো
-কিরে, মুখটা হুটকির মত কইরা কই যাওন ধরছস?
-যাইনা, বাইর হইছি মাত্র। 
-আয়, বয়। চা খাবি?
-তুইতো জানোস, আমি শক্তের মধ্যে লোহা আর নরমের মধ্যে গু এই দুইডা জিনিস ছাড়া সব খাই! ক, চা দিতে ক খাই।
-মোকলেস ভাই, চা দাও দুইডা। লগে কুকিজও দিও। 
দোকানি মোকলেস জাবেদ ও মকিম দুজনকেই ভালো ভাবে চেনে। হারে মাংসে বজ্জাত দুইটা। বাকি খাওয়ার সময় হুস থাকে না! টাকা চাইলে উল্টো ঝাড়ি মারবে। তাই দোকানি মোকলেস সতর্ক করতে বললো
-চা-বিস্কুট কিন্তু বাকি হইবো না! 
-তোমার কাছে বাকিতে চাইছে কেডা?
-না, সতর্ক করলাম আরকি!
-বাকি খাইছি, আর টাকা দেইনাই এমন হইছেনি কোন সময়?
-দুই একবার যে হয়নাই সেইডা কইতে পারবা বুকে হাত দিয়া?
-হেই কবে একবার না দুইবার দিতে একটু দেরি হইছিলো, সেই খোডা কি জীবন ভইরা দিবানি মিয়া? দেরি করছি, মাইরা তো খাই নাই না?
-খোডা দেই নাই ভাই, মনে করাইয়া দিছি আরকি! পাইছি তয় জানের কিছু থাকে নাই!
-হইছে, হইছে। চা দাও এহন। টাহা কি আগে দেহান লাগবো নি?
-দেহান লাগবো না, যাওনের সময় খালি দিয়া গেলেই হইবো।
-দিমু, দিমু, এহন চা-কুকিজ দাও।
দোকানি মোকলেস মিয়া দুইটা কুকিজ দিলো দুজনকে। কুকিজ একটা আজব বিস্কুট। দুই মাথা ইংরেজী এস অক্ষরের মত বাকানো থাকে। কেন যে সোজা করে না বুঝতে পারে না মোকলেস। মনে মনে ভাবে, সোজা করলে এমন কি ক্ষতি হইতো? জায়গা বেশি লাগতো না ময়দা বেশি লাগতো না বানাইতে কয়লা বেশি লাগতো কি জানি! জাবেদ আর মকিমকে কুকিজ ধরিয়ে দিয়ে চা বানানো শুরু করলো মোকলেস। জাবেদ তাড়া দিলো
-চা হইতে হইতেতো কুকিজ শেষ হইয়া যাইবো। চা দিয়া কুকিজ ভিজাইয়া ভিজাইয়া খাইমু চিন্তা করছি! আর চা বানাইতে কি দুধ বাড়ি থিকা গরু দোয়াইয়া আইন্না তারপর বানাইবা নাকি?
-আমিতো যন্তর না যে টিপ দিলেই চা পড়বো! বানাইতে আছি। এত তারাহুড়া করতাছো যে? লঞ্চ ছাইড়া দিবো নাকি?
-লঞ্চ ছাড়বো কেন? খিদা লাগছে, সকালে কিছুই প্যাডে পড়ে নাই, কতা কম কইয়া চাডা দেও।
মোকলেস দুই কাপ চা নিয়ে মকিম আর জাবেদের সামনে রাখলো। জাবেদ চায়ের কাপে মুখ দিয়েই নাক কুচকে ফেললো। বিরক্তি নিয়ে মোকলেসকে বললো
-কি মোকলেস ভাই, দুধ আর চিনি কি এখন সোনারুর দোকানের সোনা মাপার নিক্তি দিয়া মাপা শুরু করছো নি?
-ক্যান কি হইছে?
-কি হইছে বোঝো না? না হইছে মিডা, না দিছো দুধ!
-চা খাইবা না সরবত খাইবা? সরবত খাইলে দাও বানাইয়া দেই।
মোকলেস চায়ের কাপ দুটি নিয়ে বেশি চিনি আর দুধ দিয়ে আবার দিলো। জাবেদ আর মকিম এবার কুকিজ খায় আর চায়ে চুমুক দেয়। মুখের ভাব দেখেই বুঝাযায় চা এবার পছন্দ হয়েছে। চা খেতে খেতে জাবেদ মকিমকে বললো
-এই বার ক কি হইছে? ভাবিসাবের লগে ঝগড়া করছোস নাকি?
-ঝগড়া করুম কি করতে? হাতে টাহা পয়সা না থাকলে মন খারাপ হইতে ঝগড়া লাগে? কোন কাম কাইজ নাই, আর কামকাইজ করতেও ভালো লাগে না। কিযে করি? 
-আমার লগে কাম করবি? হেই কবে একবার করছিলি। এরপর তো আর গেলি না। 
-তোর কি মনে নাই? একবার গেছিলাম তোর লগে! পরদিনইতো কিস্তিতে জুতার পিডান খাইছি। এক কিস্তি না, তিন জনে তিন কিস্তি পিডাইছে। আবারও জুতার পিডান খাওয়াইতে চাস নাকি? চা-কুকিজ খাওয়াইতে চাস খাই, কিন্তু জুতার পিডান আর খাইতে চাই না।
-প্রত্যেকবারই কি একরকম হয়? ঐডাতো একটা একসিডেন্ট আছিলো। একসিডেন্টতো একসিডেন্টই! 
-নারে ভাই, আমারে এসব কামে সয় না। মাদবর সাবের জুতাযে সারাই করা আছিলো আমি কি জানি? আর যে মুচি জুতা সারাইছে ওরে পাইলে আমি নিজেই জুতা দিয়া পিডাইতাম। শালায় জুতায় তারকাটা মারছে, ঠিকমত মাতা বোতা করবো না! জুতার পিডানে যা ব্যাতা পাইছি তারচেয়ে বেশি ব্যাতা পাইছি তারকাটায়। এখনও দাগ আছে পিডে। 
-পিডানতো আমিও খাইছি। একবার জুতার পিডান খাইলেই কি থামতে হইবো? কামডা আন্তরিকতার সাথে করতে হইবো না? এইযে কাইল সাতটা বড়ি থেকে বদনা চুরি করছি। কুত্তার কারনে অন্তত দুই মাইল দৌডান লাগছে! অল্পের জন্য কামড়াইতে পারে নাই! হেই বদনা বেচা টাহায়ইতো কুকিজ হান্দাও!
জাবেদের কথায় মকিমের মন কিছুটা গলে গেলো। একটু দ্বিধা দন্ধের মধ্যে আছে। কিন্তু পাতলা কাম ছাড়া মকিমের কোন কাজ ভালো লাগে না। চিন্তা করলো আবার শুরু করবে। বউকে কথাটা জানানো যাবে না। আগের বার জুতার বাড়ি খাওয়ার পর অনেক কাদছে। সেবা করছে ঠিকই, তবে কড়াল করাইয়া ছাড়ছে যেন আর ওপথে না যাই। মকিম বললো
-ঠিক আছে যামু আমি। কি করবি চিন্তা করছোস?
-সময় মত কইমুহানে! সন্ধায় বাজারের উত্তর মাতায় দেহা করিস।
চা খাওয়া শেষে জাবেদ চকচকে নতুন একটা একশ টাকার নোট মোকলেসের মুখের সামনে ধরে বললো ‘দাম রাখো’। এর পর মকিম আর জাবেদ যার যার পথে চলে গেলো। জাবেদের বাড়ি পশ্চিম পাড়ায়। যাওয়ার সময় দেখা জমিলা চাচির সাথে। জমিলা চাচির সাথে জাবেদ একটু খাতির করার চেষ্টা করে। কুশলাদি জানতে চায়, বড় মেয়েটা কেমন আছে এসব আরকি!
জামিলা চাচির তিনটা মেয়ে, কোন ছেলে নাই। জামিলার স্বামী রিক্সা চালায়। তিন চাকার উপর রিক্সা দাড়িয়ে থাকলেও ঐ আয়ের উপর সংসার ঠিকমত দাড়িয়ে থাকতে চায় না। রিক্সার ভারাসাম্য তিন চাকায় ধরে রাখে কিন্তু সংসারের ভারাসাম্য রাখা কঠিন। বাজারে ভ্যান বেরিয়েছে। একটি ভ্যানে ছয়জন যাত্রী টানতে পারে। রিক্সায় দুইজনের বেশি টানা যায় না। ভ্যানে মালামালও টানা যায় বেশি, রিক্সায় মালামাল বেশি নিতে পারে না। ফলে রিক্সার চেয়ে ভ্যানে ভাড়া খরচ কম হওয়ায় এখন মানুষ রিক্সায় খুব একটা উঠতেই চায় না। রিক্সা চালিয়ে আয় এতটাই কমেছে যে সংসার চালিয়ে মেয়েদের পড়াশুনা করানতো দুরের কথা তিন বেলার জায়গায় দুই বেলা ভরপেট খাবার তুলে দেয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে। একটু বাড়তি আয়ের আশায় জমিলা স্থানীয় এক এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েছে।
স্বামীর কাছ থেকে প্রতিদিন কিছু টাকা নিয়ে কয়েকদিন সমিতিতে চাঁদা দিয়েছে। এর পর ঘুরে ঘুরে ঋণ পাওয়ার সুযোগ এসেছে জমিলার। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ঋণ তুলে একটা ছাগল কিনেছিলো। একটা বাচ্চা সহ ছাগল কিনেছিলো। এখন বেড়ে তিনটা হয়েছে। একটা খাশির বাচ্চা বেশ বড় হয়েছে। বাচ্চাটা আরেকটু বড় হলে সামনের কোরবানির ঈদে বিক্রি করে ভালো টাকা পাবে বলেই জমিলার আশা। খাশিটা বিক্রি করে টাকাটা খরচ করবে না চিন্তা করেছে। বড় মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ওর জন্য দুটি কানের দুল বানাবে। বিয়ে দিতে হবে মেয়েটাকে। হঠাৎ করে গয়না কিনতে পারবে না, আর রিক্সার আয় দিয়েযে করবে তারও সম্ভাবনা দেখছে না।
জমিলাকে দেখে দাড়িয়ে গেলো জাবেদ। জমিলার চেয়ে ছাগলের দিকে বেশি মনোযোগ জাবেদের। জাবেদ জিজ্ঞেস করে
-কয়ডা ছাগল চাচি?
-তিনডা। বুড়াডা আবার বিয়াইবো। 
-ভালো। কয়ডা দিয়া শুরু করছিলা পালা?
-বুড়াডা বাচ্চা সহ কিনছিলাম।
-সাবধানে রাইখো। দিনকাল ভালা না।
-হ, বাইত্তে কুত্তা আছে। বাড়ির বাইরের কুত্তাকাত্তা আইলে খেদায়। গ্রামে কুত্তা কাত্তা বাইরা গেছে। কিছুই আর ঠিকঠাক রাহা যায় না!
-হ চাচি, তাইতো সাবধানে রাখতে কইলাম। 
জমিলায় মনে মনে ভাবে, তুইতো বড় কুত্তা। গ্রামে তোর জন্যইতো কোন কিছু ঠিক থাকে না! আবার হাউকারি করে। জাবেদ আর কথা না বাড়িয়ে চলে যায়। জমিলা ছাগলগুলোকে বেধে রেখে কিছু লতা পাতা তুলে। রাতে সামনে দিলে চাবাবে। গরমের রাত। দীর্ঘ রাত ছাগলগুলো যাতে খুধা পেটে না থাকে সেই ভেবে প্রতিদিনই কিছু লতাপাতা তুলে সামনে দেয়। 
সন্ধা লাগার সাথে সাথে বাজারের উত্তর মাথায় গিয়ে হাজির হয় মকিম। জাবেদের এখনও কোন খবর নাই। একটা বিড়ি ধরিয়ে কয়েকটা টান দিতে দিতেই জাবেদ এসে হাজির। দেখেই জাবেদ বলে
-কিরে, আইয়া পড়ছোস?
-হ, কইলি, তাই আইয়া পড়লাম। কি করবি চিন্তা করছো? ধরা খাওয়াবিনি আবার!
-আরে না না। ধরা খাইলে কি তুই একলা খাবি? আমি খাইমু না? 
-তুইতো চালনের ফুডা দিয়া বাইর হইয়া যাস প্রতিবার। 
-আমি চালনের ফুডা দিয়া বাইর হইতে পারলে কি হইবো? তুই ধরা খাইয়া প্রতিবারইতো আমার নাম কইয়া দেস। এর পরতো দুইজনে একসাথেই জুতার পিডান খাই!
-কি করুম? যেই মাইর দেয়, না কইয়া উপায় থাকে?
সুনসান নিরব বাজার। দুজনে বাজারের উত্তর মাথার একটা বেঞ্চে বসে। মকিম পরিকল্পনা জানতে চায়। সে খুবই উদগ্রিব। কি করবে সেই প্লান জানতে তার আগ্রহের শেষ নাই। জাবেদকে বলে
-আজ ধান্দাডা কি?
-জমিলা চাচিরেতো চিনস না?
-হ, চিনি। হের বাড়িতে কি পাবি, তিনডা মাইয়া ছাড়া?
-আরে দুর বেডা, মাইয়া দিয়া কি করুম? চাচি তিনডা ছাগল পালে। কিস্তি উঠাইয়া বাচ্চাসহ কিনছিলো। এহন তিনডা হইছে। খাশির বাচ্চাডা বেশ বড় হইছে। এখন আর বাচ্চা কইয়া লাভ নাই, পুরাই খাশি হইয়া গেছে। খাশিডাই চুরি করতে হইবো।
-কামডা কি ঠিক হইবো? কিস্তি উঠাইয়া কিনছে। চুরি করলে কিস্তি পরিশোধ করবো কেমনে?
-এইযে, তোর বিবেক আবার খাড়াইয়া গেছে! আমরা কি সবগুলা একসাথে নিমুনি? কিস্তিতে কেনা ছাগল আমরা কিস্তিতে চুরি করুম! আজকে একটা নিমু, বুড়াডা আবার বাচ্চা দিবো, চাচির বেশি সমস্যা হইবো না!
-তবুও চিন্তা কইরা দেখ! কামডা কি ঠিক হইবো?
-কোন চিন্তা করিস না, ধর খাসিডা হের জামাইরে দিছে! তুইতো বিয়া করছোস, আমি কি করছি? আমারে হের জামাই ভাবলেই হইলো!
-আইছি যহন, তহন এত চিন্তা ভাবনা কইরা লাভ নাই। কি করবি আর কখন করবি বল?
-বয়, বিড়ি টান। সময় হইলেই কইমু।
জাবেদ আর মকিম কিছুক্ষণ পায়চাড়ি আর বিড়ি টানাটানির পর রাত একটু গভীর হলে আস্তে আস্তে জমিলার বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলো। গ্রামের মানুষ সন্ধার পর পরই ঘুমিয়ে পড়ে। শুধু ঘুম নয় গভীর ঘুমে নিমজ্জিত হয়। সারা দিন প্রচুর খাটাখাটুনির পর কার মনে চায় রাত জাগতে?
জাবেদ আর মকিম জমিলার উঠানে পা রাখতেই জমিলা চাচির কুকুর কিভাবে যেন টের পেয়ে গেলো। জাবেদ ওস্তাদ চোর। পকেটে করে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে বনরুটি নিয়ে এসেছে। দুর থেকেই একটা ছুড়ে মারলো। কুকুরটা নিয়ে অমনি খাওয়া শুরু করলো। প্রথমটা খাওয়া শেষ হলে আরেকটা দিলো। সেটাও খেলো কুকুরটা। মকিম বললো
-কি করস? আমরা কি কুত্তারে রুডি খাওয়াইতে আইছি?
-কতা কইস না, দেখতে থাক। এবার চল একটু সইরা থাকি। বিশ মিনিট পর দেখবি কুত্তায় কোন জ্বালাতন করবো না। 
-হেইডা আবার ক্যামনে? আবার গেলে আবারওতো রুডি দেওয়া লাগবো, রাইত ভইরা কি ওরে রুডিই খাওয়াইমু?
-আর লাগবো না। দুইডায়ই ও কাইল দুপুরের আগে ঘুম থেকে উঠতে পারবো না। গ্যারান্টি!!
-কস কি? কি করছস? তুইতো বেশ শিয়ানা!
-খালি রুডি খাওয়াইমু আমি কি এত খারাপ লোক?
-না না! তুইতো বায়তুল মোকারমের জুতা চোরা হাজি!
-বাজে কতা কইস না! চুপচাপ অপেক্ষা কর। 
-মশায় তো চুমায়!
-জমিলা চাচির মাইয়্যায় তোর লাইগা কি কয়েল জ্বালাইয়া রাখবো? মশায় তো কামড়াইবোই। হাত নাড়, যাইবো গা। 
মিনিট বিশেক পরে জাবেদ আর মকিম হাটা দিল জমিলার ঘরের দিকে। ছোট্ট ঘরের পাশেই একচালা দিয়ে ছাগল রাখার ঘর করছে। ঘরের ঝাপ দড়ি দিয়ে বাধা। বাধন খুলে ভিতরে প্রবেশ করে দেখে ছাগল শুয়ে শুয়ে পান চিবোনের মত ঘাষ চিবুচ্ছে। খুটির সাথে বাধা খাশির গলার দড়িয়া খুলে মকিমের হাতে ধরিয়ে দিলো জাবেদ। এবার যখন আরেকটা খুলতে যাবে তখন মকিম বাধা দিলো। চোর হলেও ইমান মজবুত। জাবেদকে থামিয়ে বললো
-এমন কতাতো ছিলো না! খাসিটা নেওয়ার কথা, লইছি, এখন ভালোয় ভালোয় চল। এমন ভাবে মাথার মাঝে বাড়ি মারার দরকার নাই। অভিষাপে ছারখার হইয়া যামু। 
-তোর ইমান তো দেহি টনটনা! আচ্ছা যা, খাসিডা লইয়াই যাই। আরেকদিন আরেকটা নিমুনে। রাইখ্যা খাইতে হইবো। একদিনই সব খাইলে পরে খাইমু কি? তোর বুদ্ধিটা খারাপ না! এইবার চল।
মকিম খাশির মাথা ঢেকে কোলে নিয়ে হাটা শুরু করেছে! পিছন পিছন জাবেদ হাটতে শুরু করলো। এমন সময়ই কুকুর ঘেউ ঘেউ করা শুরু করলো। জাবেদ তো তাজ্জব! এ কেমন করে সম্ভব! ঘুমের ওষুদ মিশানো দুইটা বনরুটি খাওয়াইছে। এরপরও কিভাবে ঘুম ভাঙ্গে। ঔষধ কোম্পানির উপর আসলে ভরসা করা যায় না। ভেজালে দেশটা ছেয়ে গেছে। সব কিছুতে ভেজাল দেয় দিক আছে, তাই বলে ওষুধেও? অবাক হয়ে যায় জাবেদ। কুকুরের ডাকাডাকিতে ছাগল এবার সাহস পেয়েছে। সেও মেতাতে শুরু করলো। কুকুরের ঘেউ ঘেউ আর ছাগলের মেতানিতে জমিলার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। জমিলা বুঝতে পারলো ঘটনা কি। তারাতারি স্বামীকে ডেকে তুললো। জমিলা ও তার স্বামী দরজা খুলে চেচাতে থাকলো। চোর চোর বলে শোর দিতেই আশেপাশের প্রতিবেশিরাও ঘুম থেকে উঠে টর্চ লাইড নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। মকিম বললো 
-কাম শেষ। ধরাই মনে হয় পইরা গেলাম। 
-তুই আসলে একটা কুফা। আমার আগেই বুঝা উচিত আছিলো। তোরে লইয়া কামে বাইর হইলেই ধরা খাই। বদনা চুরি করলাম তাতে ধরা খাইলাম না, তোরে নিয়া আইয়া আজ ধরা খাইয়া যামু! দৌর দে।
-ছাগল কি করুম। ছাইরা দিমু?
-জানে বাঁচলে অনেক ছাগল চুরি করতে পারবি। এখন ফালাইয়া দৌর মার। আগে জান বাঁচা। 
মকিম ছাগল ফেলে দৌর দেয়ার আগেই লোকজন লাইট নিয়ে বের হয়ে গেছে। জাবেদ আর মকিমের দিকে সবাই লাইট মেরে রাখছে। মকিম ছাগল ছেড়ে দিয়েছে হাত থেকে। ছাগল মেতাচ্ছে। দৌর দেয়ার সুযোগ আর নেই। সবার হাতেই দেশীয় অস্ত্র। কেউ টেঁটা, কেউ সড়কি, কেউ হুনকোচ, কেউ লাঠি, কেউ কাফলার ডাল ভেঙ্গে নিয়ে আসছে। দৌর দিলে যদি টেঁটা মারে তবে কাম শেষ চিন্তা করে ওরা দুজনেই দাড়িয়ে রইলো।
সবাই কাছে আসলে প্রথমেই জাবেদ মুখ খুললো। এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো
-কি হইছে? এমনে চাইয়া রইছেন ক্যান? আমরা কি করছি?
‘কি করছ বুঝ নাই এহনও? কাউফলা দিয়া পাছায় কয়েকটা মারলেই টেরপাইবা।’ জমিলার স্বামী বললো। জমিলা দৌড়ে গিয়ে খাশিটা কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে থাকলো। কাদছে আর খাশির গায়ে হাত বুলাচ্ছে। দুজন এসে জাবেদ আর মকিমের হাত দুটি পিছনের দিকে নিয়ে ছাগলের দড়ি দিয়েই বেধে ফেললো। জাবেদ ও মকিমকে নিয়ে জমিলার বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলো সবাই। জমিলার বাড়িতে নিয়ে উঠানের পেয়ারা গাছটার সাথে বেধে রাখলো। উৎসাহি যুবকেরা কয়েক ঘা মাইর দিতেই চেচানি শুরু করলো দুজন। এলাকার মুরুব্বিরা যুবকদের থামিয়ে দিয়ে বললো
-থাম, মারার দরকার নাই। বেতালে বাড়ি পরলে মইরাও যাইতে পারে। চোর মাইরা মাডার কেসের আসামী হওয়া লাগবো। মারার দরকার নাই। যা করার কালকে সকালে চেয়ারম্যান সাবের কাছে নিয়াই করবো। কয়েকজন ওদের পাহারার জন্য থাক। সকালে চেয়ারম্যানের বাড়ির উঠানে নিয়া আসিস। সবাই থাকুম আমরা।
এই বলে আস্তে আস্তে সবাই চলে গেলো যার যার বাড়ি। সকালে চেয়ারম্যান কোলাহালের কারনে উঠে গেলো। বাইরে এসে দেখে দুই চোর সহ এলাকার মানুষ এসেছে। জানতে চাইলে সবাই একসাথে বলতে শুরু করলো। চেয়ারম্যান সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললো
-একজন একজন করে বলো।
এক মুরুব্বি উঠে বললো 
-চেয়ারম্যান সাব। ওদের কারনে কেউ শান্তিতে থাকতে পারে না। পরশু রাতে কারো বাড়ির সিলভারের আর পেতলের বদনা রাখে নাই। প্লাস্টিক আর মাটির বদনা বাদে সব সাফ কইরা ফালাইছে। কাল রাতে জমিলার খাসিটা নিয়ে রওয়ানা দিয়েছে। আমরা সবাই হাতে নাতে ধরছি। একটা উপযুক্ত বিচার করোন লাগবো। 
-খালি কি তোমাগোডাই নিছে! আমার বদনা, আমার মায় যেইডায় কইরা রাইতে মোতে সেই পিতলের পিসপটও নিয়া গেছে। তোমরা কইছো, আমিতো কই নাই সরমে! কত বড় সাহস চিন্তা করা যায়?
-তাইলে আপনিই ওদের বিচার করেন। 
চেয়ারম্যান ওদের কাছে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন এমন কাজ আর করবে কিনা? ওরা দুজনেই মাইরের ভয়ে জানালো আর করবে না। তখন চেয়ারম্যান ঘোষনা করলো যে ওরা এই এলাকায় থাকতে পারবে না। সেই শর্তে ওদের ছেড়ে দেয়া হবে। নয়তো পুলিশে দেয়া হবে। সাথে দশটা করে জুতার বাড়ি দেয়া হবে। উপস্থিত সবাই এক বাক্যে চেয়ারম্যানের সাথে সায় দিলো। উপস্থিত দুজন করে ষন্ডা মার্কা যুবক দুই কিস্তিতে জুতাপেটা করলো। জুতা পেটা করার পর জাবেদ ও মকিমকে চেয়ারম্যান বলে দিলো,
-তোদের যদি এই এলাকায় আর দেখি তবে কি শাস্তি অপেক্ষা করতাছে তা তোরা চিন্তাও করতে পারছিস না। এলাকা ছেড়ে চলে যাবি এবং নতুন জায়গায় নতুন ভাবে মাথা উচু করে বাঁচবি। এসব আকাম ছাকাম ছেড়ে দিবি, ঠিক মনে থাকবে।
-জি চেয়ারম্যান সাব, মনে থাকবে।
বিচারের পরে জাবেদ আর মকিম শরীরে প্রচন্ড জুতা পেটার ব্যথা নিয়ে যার যার বাড়ি চলে গেলো। বাড়ি গিয়ে মকিম তার স্ত্রীকে বললো, 
-সব গুছাও। এই এলাকায় আর থাকা যাবে না। 
-তোমারে কতবার কইছি ভালো হইয়া যাও! আমার কথা শুনলা না। আজ আবার মাইর খাইলা। এখন আমি সমাজে মুখ দেখাবো কেমন করে, সেইটা একবার চিন্তা কইরা দেখলা না!
-আমি এই এলাকায় আর থাকবো না। আর তোরে আজ কথা দিলাম, আমি ভালো হইয়া যাইমু। এমন কাম আর কোনদিন করুম না। এই এলাকায় থাকলে আমি ভালো হইতে পারুম না। সবাই আমায় খোটা দিবো। চাইলেও ভালো থাকতে পারুম না। চল এই এলাকা থেকে যাইগা।
-তুমি কি কতা রাখবা? আবার যদি কর?
-না, তোর মাথা ছুইয়া কথা দিলাম। আমি কষ্ট কইরা খামু, তবুও আর এই পতে যামু না। আমারে বিশ্বাস কর।
-বিশ্বাস কইরা কইরাইতো এতদিন ধইরা সংসার করতাছি। আইজও করলাম। চলো, যাইগা। নতুন কোন জায়গায় বাসা নেই। তয়, কই যাইবা?
-ঢাকা যামুগা। বিশাল জায়গা, কোটি মানুষ। একটা না একটা কাম কাইজ জুটবোই। কাম কইরা খাইমু। 
মকিম ঢাকায় এক বস্তিতে ছোট্ট একটা ঘর নিলো। পরিচিত এক লোকের মাধ্যমে একটা রিক্সা নিলো। প্রতিদিন রিক্সা চালিয়ে যে আয় করে তার থেকে খরচের টাকাটা বাদ দিয়ে বাকি টাকা বউয়ের হাতে তুলে দেয়। সংসারে দুজন মানুষ। খরচ খুব একটা বেশি করে না মকিমের বউ। মকিম সারাদিন পরিশ্রম করে যা আয় করে তার বড় একটা অংশ চলে যায় রিক্সা মালিককে ভাড়া বাবদ দিতে। মকিমের বউ পাশের ঘরের ভাবিদের সাথে একটা সমিতি করেছে। ভাসমান সমবায় সমিতি। স্থানীয় একটি এনজিওর এক আপা এসে প্রতিদিন সমিতির চাঁদা নিয়ে যায়। সঞ্চয় বেশ ভালোই জমেছে। অন্য সদস্যরা ঋণ নিয়েছে আগেই। এবার মকিমের বউয়ের পালা। মকিম রাতে বাড়ি আসলে বউ বলে,
-তুমিতো অনেক কষ্ট কর। যা আয় করো তার বড় একটা অংশ চইলা যায় মালিকের ভাড়া দিতে। নিজে যদি একটা রিক্সা কিন তাইলে যা আয় করবা তার পুরাটাই তোমার থাকতো। তখন পরিশ্রম আরেকটু কম করলেও চলতো। তুমি একটা রিক্সা কিনো।
-রিক্সা কিনুম টাকা পাইমু কই। প্রতিদিন যা একটু একটু কইরা জমাইছো তাতে কি রিক্সা কিনা যাইবো, একটা চাক্কাও কিনা যাইবো না। 
-তুমি চিন্তা কইরো না। আমি কিছু সঞ্চয় করছি। এখন ঋণ নেওয়ার পালা আইছে। আমি ঋণ নেই। তুমি একটা রিক্সা কিনো!
সমিতির থেকে ঋণ নিয়ে মকিম একটা রিক্সা কিনলো। আয় রোজগার ভালোই হয় এখন। তবে রিক্সা মালিকের জমার মতই বড় অংকের একটা টাকা চলে যায় ঋণের কিস্তি বাবদ। কিস্তির কথা মনে পরলে মকিমের ঘুম আসতে চায় না। এ এক নতুন আপদ ঘরে এসেছে। মাঝে মাঝে ভাবে, এর চেয়ে ভাড়ার রিক্সাই ভালো ছিলো। এতটা চাপ ছিলো না। এখন ঋণের কিস্তি দিতে দেরি হলে বা দিতে না পারলে সমিতির লোকজন এসে বউকে বকাঝকা করে, খারাপ ব্যবহার করে। মকিম সকল লাঞ্চনা-বঞ্চনা নিজে সহ্য করতে রাজি কিন্তু বউকে সে কোন কটু কথা শুনাতে চায় না। 
মকিম বউকে খুবই ভালোবাসে। শত কষ্ট হলেও সে বউকে কষ্ট দিতে চায় না। পূর্বে এদিক ওদিক করলেও এখন সে বউয়ের প্রতি খুবই আন্তরিক। বউ ছাড়া অন্য কোন মেয়ের সাথে সম্পর্ক করার কথা চিন্তাও করে না। এত ভালোবাসার বউকে যদি সমিতির লোকজন এসে দুর্ব্যাবহার করে যায় তা কি সহ্য করার মত? সম্প্রতি রিক্সা চালিয়ে আয়ও অনেক কমে গেছে। সপ্তাহে দু এক কিস্তি মিস হয়ে যাচ্ছে। এটা মকিম ইচ্ছাকৃত করে না। রাস্তায় নামলে প্রতিদিন যে একই রকম আয় হবে তাও কিন্তু নয়। 
চৌদ্দ ফেব্রুয়ারি। রিক্সা নিয়ে নেমেছে মকিম। সারাদিন রিক্সা চালিয়েছে। জোড়ায় জোড়ায় ছেলে মেয়ে ঘুরছে। সারাদিন জোড়ায় জোড়ায় যাত্রী টেনেছে মকিম। সন্ধা হওয়ার সাথে সাথে চিন্তা করলো আজ আর কাজ করবে না। বাসায় চলে যাবে। বউকে একটু আদর করবে, ভালোবাসবে। চাইলে বউকে নিয়ে রিক্সায় ঘুরবে। বউ যদিও মকিমের রিক্সায় চড়তে চায় না। মকিম কষ্ট করে চালাবে আর সে বসে থাকবে সেটা সহ্য করতে পারে না। মকিম বাসায় গিয়ে দেখে বউ বসে আছে। মকিম বললো
-চলো আজ বাইরে ঘুরতে যাবো।
-আজ হঠাৎ ঘুরতে যাওনের কি হইছে।
-আজকে নাকি ভালোবাসোনের দিবস। গরিবের কি ভালোবাসা নাই? আমরাও চলো ঘুরতে যাই।
-না, না। আমার সরম লাগতাছে। তুমি কি যে কও! 
-চলোই না। যাই।
-আমার কাম আছে। রান্দোন লাগবো।
-লাগবো না। রাইতে ঘুইরা ঘাইরা বাইরেই খাইয়া লইমু।
মকিম তার বউকে নিয়ে বেরিয়ে পরলো। একটা রিক্সা ভাড়া করলো। ঘন্টা চুক্তিতে রিক্সা নিলো। দুই ঘন্টা শহর দিয়ে ঘুরিয়ে আবার এই বস্তিতেই নামিয়ে দেবে। মকিম ঘুরাঘুরি ফাকে ফাকে বউকে চটপটি, ফুচকা খাওয়ালো, ফুটপাত থেকে আলু পুরি কিনে রিক্সায় বসে খেলো। দারুন সময় কাটলো দুজনের। বাসায় ফিরে এসে অনেক রাত হওয়ায় শুয়ে পড়লো। সারাদিন যুবক যুবতিদের ভালোবাসাবাসির কর্মকান্ড দেখে বউকে একটু আদর করতে মন চাইলো। হাতটা ধরে কাছে টেনে নিয়ে গল্প করলো। আদরের এক পর্যায়ে বউ বললো
-কালকে কিন্তু কিস্তি দিতে হইবো, মনে আছে?
মকিম এবার বউয়ের হাতটি ছেড়ে দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো। মকিমের বউ মকিমের নিরবতা দেখে বললো
-কি হইলো! ঘুমাইয়া পরলা নাকি? আদর গেলো কই? চুপ হইয়া গেলা যে?
-না, এমনিই!
-কি হইছে বলো, একটু আগেতো কতা বার্তা কইলা। হঠাৎ কইরা চুপচাপ হইয়া গেলা, কারন কি?
-কোন কারন নাইরে বউ!
-কারনতো একটা আছেই। নইলে হঠাৎ কথা বন্ধ কইরা দিলা যে। কি হইছে বলো। আমার কোন অপরাধ?
-কিছু না। আসলে কিস্তির কতা উডাইলা পরে সব কিছু মাটি হইয়া গেলো। এখন আর কিছুই ভালো লাগতাছে না। সব যেন ভিতরে ঢুইক্কা গেলো। বউ, কিসের লাইগা যে কিস্তির কতা মনে কইরা দিলা! আরেকটু পরে কইলে কি হইতো বলো? কিস্তি এমন একটা জিনিস, এই কথা মাতায় আসার সাথে সাথে সব সুখ উইড়া যায়। তোমার কোন দোষ নাই বউ! হায়রে কিস্তি............দিতে না পারলে বউও নিয়া যাইতে চায়! কেন যে কিস্তি উঠাইয়া রিক্সা কিনতে গেছিলাম!

Thursday, February 14, 2019

বালিকা নিয়ে কবিতা...বালিকা বন্দনা.....

বালিকা-১

বালিকা তোমার দুরন্ত ছোটাছুটি
খিলখিলিয়ে হাসির লুটোপুটি
বালিকা তোমার বাঁকা ঠোটের হাসি
দেখতে আমি অনেক ভালোবাসি।

বালিকা তোমার অকপটে কথা বলা
খুনসুটি আর ছোট ছোট ছলা কলা
বালিকা তোমার আকাশ পানে চাওয়া
আমার কাছে আকাশ হাতে পাওয়া।

বালিকা তোমার ছি-কুতকুত খেলা
বৌয়াছি আর গোল্লাছুটে যায় বেলা
বালিকা তুমি এসব কর যখন
তোমায় আমি ভালোবাসি তখন।

বালিকা তুমি শিখবে কখন পড়া
হৃদয় বুঝে হৃদয়টাকে ধরা
বালিকা আমি আছি প্রতিক্ষাতে
কখন রাখবে হাতটি আমার হাতে?
০৫/০২/২০১৯


বালিকা-২

বালিকা তুমি আমার হবে কবে
আমি যখন তোমার হবো, তবে?
আমিতো তোমারই হয়ে আছি
তোমায় নিয়েই স্বপ্ন দেখে বাঁচি।

বালিকা তুমি আমায় বুঝবে কখন
ভালোবেসে জীবন দিলে, তখন?
ডুবেছি তোমার প্রেম সাগরে পরে
আমিতো সেই কবেই গেছি মরে।

বালিকা তোমায় বুঝাই কেমন করে
আমার মনে যতটা প্রেম ধরে
তারচেয়েও বেশি ভালোবাসি
বারবার আমি তাইতো ফিরে আসি।

বালিকা তোমার আবাস এ হৃদয়ে
তোমার জন্য হৃদয় যাচ্ছে ক্ষয়ে
উথাল পাথাল ঢেউয়ের তোরে আমার
ভাঙ্গছে দেখো হৃদয়ের প্রেম খামার।
১০/০২/২০১৯


বালিকা-৩

বালিকা, কাল বসন্ত এসে গেছে
কলি থেকে ফুল ফুটেছে পলাশ গাছে
বালিকা তোমার বসন্ত কি আসেনাই?
আমি আছি, তোমার বসন্তের প্রতিক্ষায়ই।

বালিকা তোমার হৃদয়ের ছোট্ট কলি
ফুটলে পরে হবো আমি অলি।
অলি হয়ে করবো নাচানাচি
কলি ফোটার অপেক্ষাতেই আছি।

বালিকা তোমার ফুলের সুবাশ নিতে
বসন্তের আসায় কষ্ট সইলাম শীতে
মালি হয়ে দিচ্ছি পানি মূলে
অপেক্ষাতে বিদ্ধ হই ত্রিশুলে।

বালিকা আমার কষ্ট বুঝবে কবে?
কষ্টানলে অঙ্গার হলে তবে?
তোমার জন্য কষ্ট সইতে রাজি
জীবনটাকে ধরতে পারি বাজি।
১৩/০২/২০১৯

বালিকা-৪

বালিকা আজ ভালোবাসা দিবসে
তোমায় দেখার আশায় আছি বসে
একশ একটা নীল পদ্ম হাতে
দরজাতে দাড়ালাম প্রভাতে।

তোমার হয়তো মনে হবে প্রলাপ!
সাথে এনেছি একশ একটা গোলাপ
বালিকা আমি প্রলাপ বকি নাকো
আমি চাই তুমি আমারই হয়ে থাকো।

তোমার জন্য বাদাম আর চকোলেট
কেন তুমি করছো বলো লেট?
গেলে তুমি ঘুরতে আমার সাথে
ঝালমুড়ি আর ফুসকা দেব হাতে।

তোমার জন্য আকুল আমার প্রান
ভাবিনা কিসে মান আর অপমান
তোমায় আমি অনেক ভালোবাসি
বুঝনা তবুও বার বার আমি আসি।
১৪/০২/২০১৯


বালিকা-৫

বালক চেয়ে থাকে বালিকার পানে
বালক কাছে আসে বালিকার টানে
বালিকা বুঝে না, সেটা বুঝে বালকে
বালিকাই হুর, আধার কী আলোকে।

বালিকার প্রেমে হয়েছে বিহ্বল
লোক নিন্দা, ভয় করেনা আমল
সমাজ কি বলে, বলে পরিবার?
বালিকাকে নিয়ে হবে ভব পার।

এজনম হায়, বালিকারই তরে
না পেলে তারে, সুখ হবেনা মরে
তাই দিবা নিশি, ভাবি তার কথা
বুঝবে সে কবে হৃদয়েরই ব্যথা?

আমি হবো কৃষ্ণ বালিকা হোক রাধা
আমি হবো ফরহাদ ডিঙ্গাবো সব বাধা
আমি হবো শাজাহান বলিকা মমতাজ
আমার হৃদয় জুড়ে করুক সে রাজ।
১৪/০২/২০১৯
বালিকা-৬

বালিকা তুমি বিকশিত হও,
তুমিতো অন্যদের মত নও!
তোমায়যে আমি দেই পাহারা
তোমায় না পেলে হব সর্বহারা।

তোমায় না দেখলে মন অসান্ত
তোমার পরশে হইযে যাই শান্ত
তোমার শুন্যতায় হই উথাল-পাথাল
তোমার পূর্ণতায় রেঙ্গে হই লাল।

তোমার হাসি দেখে হৃদয় নাচে-হাসে
তাইতো থাকি তোমার আশে-পাশে
করি সদা তোমার অপেক্ষা
কখন যে পাই তোমার দেখা!

তোমায় কেন এত ভালো লাগে?
সেকথা বুঝিনি দেখার আগে
এখন দেখি তুমিই মরন
সারাবেলা করি তোমাকে স্মরণ।
১৮/০২/২০১৯

বালিকা-৭

বালিকাটির নয়ন পটর চেরা
দেখলে মনে হবে সে মন চোরা
বালিকাটির হাসি শক্তিশালী
দেখলে হৃদয় হয়যে ফালিফালি।

বালিকাটির গালে ছোট্ট টোল
অঙ্গযে তার তানপুরারই খোল
বালিকাটির চলন বলন বেশ!
দেখে আমি হয়ে গেছি শেষ।

বালিকাটির জোড়া ভূরুর খেলা
দেখে দেখে কাটে সারা বেলা
কাজল কালো চোখের মনি দুটি
দেখার পরেই লেগেছে মোর শনি।

বালিকাটির ঘন কালো কেশ
দেখার পরে কাটে না তার রেশ
এক দেখাতেই কাটে সরা দিন
কেমনে করি তোমায় হেরা’র ঋণ?
১৯/০২/২০১৯


বালিকা-৮

বালিকা তোমার রুপের এত ঝলক
দেখলে পরে পড়ে নাতো পলক
কেমনে করি রুপেরই ব্যবচ্ছেদ
তাইতো আমার হৃদয়ে এত খেদ।

তোমার কানে ঝুলছে ঝুমকা ফুল
লজ্জা পায় সে তুমিয়ে খাটি ফুল!
তার কাছেতে তুমিই অলংকার
পড়তে চায়সে করে গলার হার!

কাশফুলেতে বুলাও যখন পরশ
তোমার রূপ তারচেয়েও সরেস!
কাশফুলগুলো পায়যে তখন শরম
ভাবে ওরা, হাতটা কিযে নরম!

ছুটো যখন ঘাসফড়িংয়ের পিছন
নেচে ওঠে ফড়িংয়েরই দেহ-মন
আমি দেখি ফড়িং-তোমার খেলা
আনন্দে ভাসাই স্বর্গপানে ভেলা।
১৯/০২/২০১৯


বালিকা-৯

বালিকার চোখ হাসে ঝলোমল
দেখতে যেন দীঘির কালো জল
ওই জলেতে ডুবে গেছি আমি
সে জানেনা, জানে অর্ন্তজামি।

চিকন কালো ভুরুর নাচন দিলে,
আমার হৃদয় ধড় হতে কেড়ে নিলে
দেখে তোমার ঠোটের বাকা হাসি
গলায় পড়লো তোমার প্রেমের ফাঁসি।

বলবো কি আর তার গালেরই কথা
গালটিযে তার বিশাল কাব্য গাথা
টোল পড়া গাল, রুপে চাঁদের মত
কলঙ্ক নয়, অপরূপ সেই ক্ষত।

ঠোট বাকালে গালদুটো তার হাসে
টোল পড়া গাল সবাই ভালোবাসে
ঠোটের কোনে ছোট্ট তিলকখানি
অঢেল রূপযে তাকে দিলো আনি।
১৯/০২/২০১৯

বালিকা-১০

বালিকাটির নাকে পড়া নোলক
রূপ দেখে পাগল হলো ভূলোক
আমি পাগল হয়েছি সেই কবে
মরেই যাব তাকে না পেলে ভবে!

বালিকা তোমার নাকটা যেন বাশি
দেখতে বেশ, যেমন তোমার হাসি!
সরু ডগায় ঘাম বিন্দু বিন্দু
বিন্দুতেই আছে প্রেম সিন্ধু।

নাক ফুলিয়ে যখন কাদো তুমি
সব লাগে যেন বিরান ভূমি
চোখের কোনে অশ্রু দেখি যখন
ধরণীটা তুচ্ছ লাগে তখন।

বালিকা যখন উচ্ছল, খেলে-হাসে
পৃথিবীটা হাতের মুঠোয় আসে
মুখটি যখন করে রাখে ভার
প্রাণটা আমার হয়ে যায় বার।
১৯/০২/২০১৯

বালিকা-১১

বালিকা নিয়ে কাটছে সময় বেশ!
কাটতে চায় না তার রূপেই রেশ
হাবুডুবু খাচ্ছি তাহারই প্রেমে
কারো কথায় যাবো নাকো থেমে।

এমন রূপের কদর যদি না করি
এমন রূপের প্রেমে যদি না পরি
এমন রূপের শোভা যদি না হেরি
শান্তি পাবোনা এই ধরণী ছাড়ি।

বালিকাটির রূপের এতই ঝলক
দেখলে পরে পড়বে নাতো পলক
এক দেখাতে কাটবে হাজার সন
তাইতো দিলাম বালিকাকেই মন।

তোমায় পেলে চাই না আমি হুর
সব কিছুকে করবো যে দূর দূর!
তোমায় পেলে সব যে হবে পাওয়া
তাইতো শুধু তুমিই আমার চাওয়া।
২০/০২/২০১৯

বালিকা-১২

বালিকা তুমি বালিকা হয়েই থাকো
রমনী কিংবা বুড়ি হইও নাকো
থাকো তুমি দূরন্ত চিরদিন
রূপটা থাকুক চির অমলিন।

বালিকা তুমি হাসি-খুশিই থেকো
মুখটি কভু ভর করিও নাকো
অশ্রু জলে ভিজিওনা দুটি চোখ
তোমার জীবন আনন্দময় হোক।

বালিকা তুমি মন কোরোনা ভারী
কষ্টের সাথে দিয়ে রেখো আড়ি
আনন্দ হোক তোমার খেলার সাথী
প্রফুল্ল হোক জীবন, দিবা-রাতি।

বালিকা তুমি কষ্ট পেলে পরে
ভাসি আমি দুঃখেরই সাগরে
হৃদয় আমার ভেঙ্গে হয় খান-খান
সকল প্রাপ্তি মূহুর্তেই হয় ম্লান।
২০/০২/২০১৯





বালিকা-১৩

বালিকা তোমার রূপের ভাজে ভাজে
বলছি না, একটুও আজে বাজে!
শোভা ঝড়ে সকল অঙ্গ থেকে
মুগ্ধ আমি, সেই সোভাই দেখে।

বালিকা তোমার গোলাপী দুটি ঠোট
শক্তিশালী তোমার রূপের চোট
চলন বলন ঠমক হৃদয় কাড়া
দেখে আমি হইযে আত্মহারা!

বালিকা তোমার চিকন ভ্রু’খানি
ডাগর চোখে দীঘির স্বচ্ছ পানি
চোখ দুখানি মিলাও তুমি যখন
মুগ্ধ নয়নে তাকায় ধরনী তখন।

বালিকা তুমি চোখে মাখলে কাজল
সেই শোভা নেয় ধরনী, পেতে আঁচল
পটল চেরা তোমার দুখানা আখি
সেই সোভাটা আড়ালে কেমনে রাখি!
২৫/০২/২০১৯





বালিকা-১৪

বালিকা তোমার রাঙ্গা কপোল দুটি
দেখতে যেন, আছে পদ্ম ফুট!
কপোলেরই গোলাপী আভা দেখে
নাচি আমি খুশির আবির মেখে।

হাসলে পরে টোল দু’খানি হাসে
পরীরা দেখতে ধরনীতে নেমে আসে
দেখে তারা হিংসায় জ্বলে মরে
এত রূপসী হয়যে কেমন করে!

বালিকা তোমার থুতনি হাসে নুয়ে
মন চায় আদর করি, থুতনিটাকে ছুঁয়ে
হাত বুলিয়ে আদরে দেই ঝাকি
কিছুটা কাল থুতনি নিয়েই থাকি!

ভেংচি কাটো যখন ঠোট বাকিয়ে
মুগ্ধ নয়নে আমি, থাকি তাকিয়ে
ভেংচিতেও লাগে তোমায় ভালো
ধরনীতে ছড়ায় খুশির আলো।
২৫/০২/২০১৯





বালিকা-১৫

বালিকা তোমার কথা বলার ভঙ্গি
দেখেই বুঝেছি, তুমি বড়ই ঢঙ্গী
কথা বললে, চোখও কথা বলে
মুখটা তখন লাগে যে ঝলমলে।

বালিকা তুমি কর যখন ঝগড়া
কারো কথায় দাও যখন বাগড়া
কারো কথায় করো প্রতিবাদ
ভাঙ্গে তখন তোমার রূপের বাঁধ।

কাউকে তুমি করলে তিরস্কার
ভেবে নেয় সে এটাই পুরস্কার!
মুখ বাকিয়ে ভেংচিটা নয় মন্দ
সেরূপ দেখে সে’যে পায় আনন্দ!

কথার ফাঁকে হাসো খিলখিলিয়ে
ভেংচি কাটো যখন দাত কেলিয়ে
অল্প কথায় যখন রেগে যাও
দেখতে আমার ভালোলাগে তাও।
০৭/০৩/২০১৯





বালিকা-১৬

বালিকা তোমার মনটা হলে ভার
আমার হৃদয় হয়ে যায় ছারখার
বালিকার মন যখন মেঘে ঢাকে
ধরনী তখন আধার হয়ে থাকে!

তুমি যখন চুপ’টি করে থাকো
কারো সাথে কথা বলো নাকো
চোখের কোনে জমাও বিন্দু জল
ধরনীর চোখও হয়যে টলমল!

দুই হাটুতে মুখটি যখন ঢাকো
যতটা সময় নিরব হয়ে থাকো
এলোমেলো কেশ দু’হাটুই ঢাকে
হৃদয় আমার তখনই মেঘে ঢাকে।

বালিকা তুমি বড়ই অভিমানি
কেউ না জানুক, আমি সেটা জানি
কেউ না বুঝুক, আমি তোমায় বুঝি
আনন্দেতে তাইতো তোমায় খুজি।
০৭/০৩/২০১৯





বালিকা-১৭

বালিকা শুধু খেলতে ভালোবাসে
সখী যত আছে আশেপাশে
ষোলগুটি, এক্কাদোক্কা, লাটিম খেলা
গোল্লাছুট, মোরগ লড়াইয়ে যায় বেলা।

ছি... কুতকুত, বউচি আরো কত
টুক পলান্তি, কানামাছি, লুডু যত
কোন খেলায় নাইযে কোন ক্লান্তি
বকাঝকায়ও দেয়না যে সে ক্ষান্তি।

মার্বেল, লাটিম মোরগ লড়াই, ডাংগুলি
সখীদের নিয়ে খেলে প্রিয় খেলাগুলি
সারাদিন কাটে খেলা আর খেলা নিয়ে
ঘুমাতে গেলেও ঘুমায় পুতুল নিয়ে।

দাড়িয়াবান্ধা-কানামাছি ক্লাশ ফেলে
ফুল টোকা, ইচিং বিচিং খেলে
ওপেন টু বাইস্কোপ আর টোপাভাতি
খেলাই শুধু বালিকার খেলার সাথি।
০৭/০৩/২০১৯





বালিকা-১৮

বালিকা তুমি আঠারোতে পা’দিলে
রোমিওদের হৃদয় কেড়ে নিলে
তুমি এখন ফুটন্ত এক গোলাপ
সত্যি বলছি একটুও নয় প্রলাপ!

বালিকা তুমি ছড়াও সুবাশ এখন
চুল ছেড়ে হেটে যাও তুমি যখন
ঘন কালো চুলও তখন আলো ছড়ায়
রোমিওরা ভাবে, হুর নেমে এলো ধরায়।

হেলে দুলে ঠমকে তোমার চলা
মিষ্টি করে তোমার কথা বলা
হাসির আভা ছড়ায় দিকে দিকে
থামলে পরে ধরনী হয় ফিকে।

যখন তুমি হলে অষ্টাদশী
ধরনীতে নেমে এলো শশী
তোমায় পেতে ব্যাকুল সকল প্রাণ
শোভা নিতে আকুল সকল প্রাণ।
০৭/০৩/২০১৯





বালিকা-১৯

বালিকা বালিকা করে, করি যে বন্দনা
বালিকা আমার দেখতে যে মন্দ না
রূপে গুণে বালিকা আমার দেখতে যেন পরী!
কেমন করে আমি তাহার হৃদয়খানা ধরি?

বালিকাকে নিয়ে আমি ভাবি সারাবেলা
আমার হৃদয় জুড়ে বালিকাই করে খেলা
বালিকা সর্বদা করে হৃদয়েই বিচরণ
তাইতো তাকেই আমি দিয়েছি এই মন।

এক জীবনে বালিকা তোমায় ভালোবেসে
ভরবে না মন বুঝেছি আমি অবশেষে
তাকে দেখার আকাক্সক্ষা আমার না মিটে
তার জন্য ছাড়তে পারি আমার জন্মভিটে।

প্রেমের জ্বালা কী আমি বুঝিনিতো আগে
তার প্রেমে পড়েই বুঝি, প্রেম কেমন লাগে!
তাকে না পেলে আমার জীবন হবে বৃথা
সারাবেলা তাইতো হৃদয় ভাবে তারই কথা।
০৭/০৩/২০১৯





বালিকা-২০

কুড়িতে নয় মোর বালিকা বুড়ি
এখনও সে উড়ায় রঙ্গিন ঘুড়ি
বালিকা মোর পড়াশুনা করছে
মনযোগ দিয়ে পড়াটাকেই ধরছে।

কত প্রেমিক ঘুরছে তাহার পিছে
কেউ জানেনা ঘুরাটা তাদের মিছে!
ঘুরলে পরেই মনটা পাবে নাকো
ভাবছে মনে, থাকো, ঘুরতে থাকো!

প্রেমের চিঠি, চকলেট এটা-ওটা
মন না পেয়ে দিচ্ছে কেউ খোটা
যে যাই বলুক পড়বে না সে প্রেমে
বাঁধা পড়বেনা এখনই ছবির ফ্রেমে।

কুড়িতে এসে সবার চাওয়াই বুঝে
কিসের আশায় আমায় সবাই খুজে
মনটা দেবে তাকেই, যে সত্যি মানুষ
সবাই দেখছি উড়ায় মিথ্যে ফানুশ।
০৭/০৩/২০১৯

Monday, February 11, 2019

ভাষার ও মানচিত্রের জন্য শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধায় হোক একটি সমন্বিত স্মৃতিস্তম্ভ

আমাদের মুখের ভাষার, স্বাধীন ভাবে চলার, মাথা উচু করে দাড়াবার অধিকার এমনিতেই আসেনি। অধিকার আদায়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা যে ত্যাগ, সংগ্রাম করেছে তার ঋণ শোধ দেয়ার ক্ষমতা আমাদের নেই এবং কোন কালেও সেই ক্ষমতা হবে না। রক্তের ঋণ কখনো শোধ দেয়া যায় না, দিতে পারবোও না। কিন্তু সেই ত্যাগীদের আমরা যদি যথাযথ ভাবে শ্রদ্ধা না জানাই তবে সেটা হবে অস্তিত্বের সাথে বেইমানী, বিশ্বাস ঘাতকতা। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মই নয় আমাদের সম্পর্কে সারা বিশ্বের যে প্রান্তের মানুষই জানবে তারা আমাদের বেইমানী, বিশ্বাস ঘাতকতার জন্য ক্ষমা করবে না। বরং ঘৃণাভরে আমাদের ধিক্কার জানাবে। আমরা আমাদের সেই ত্যাগী বীরদের প্রতি সর্বদা শ্রদ্ধাশীল, অবনত মস্তকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে তাদের স্মরণ করেছি, করি এবং করবো। আমাদের দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিষ্ঠিত স্মৃতিস্তম্ভগুলো ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের নিমিত্ত তৈরী শহীদ মিনার যা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রতিরূপ। কিন্তু মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের জন্য তৈরী স্মৃতিস্তম্ভের আদলে কোন শহীদ মিনার কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চোখে পরবে না। আমাদের দেশে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা জ্ঞাপনের কিছু কার্যক্রম আছে। তবে সময় এসেছে সেই কার্যক্রমকে একটু ঢেলে সাজিয়ে আরো সুন্দর ও সাবলিল ভাবে শ্রদ্ধানিবেদন করার। আর এ কারনে প্রয়োজন একটি সমন্বিত স্মৃতিস্তম্ভ যা সরকারের উদ্যোগ ছাড়া করা সম্ভব নয়। ভাষা আন্দোলনের ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, জেলা সদরে ও উপজেলাগুলোতে একটি সমন্বিত স্মৃতিস্তম্ভ হোক সময়ের দাবী।
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। অনেকেই হয়তো সেই ইতিহাস সম্পর্কে অবগত আছেন। নতুন প্রজন্মও বিভিন্ন ভাবে জানছেন। তবুও সংক্ষিপ্ত ভাবে আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিছু কথা এই লেখায় তুলে ধরতে চাই-
১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি অবহেলা ও প্রবঞ্চনা শুরু হয়। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী প্রথম আঘাত হানে সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসীর বাংলা ভাষার উপর। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রথম মাইলফলক। তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ তথা ৫৬.৪০% অধিবাসীর ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে মাত্র ৩.২৭% অধিবাসীর ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টা করে। ভাষা আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উর্দুর সাথে বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা করা। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা সংগ্রামীরা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে তাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করে আমাদের প্রাণ খুলে কথা বলার সুযোগ তৈরী করে দিয়েছেন।
পাকিস্তান রাষ্ট্রটির জন্মের পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে বৈষম্যমুলক আচরণ শুরু করে। পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী কোন দিনই পুর্ব পাকিস্তানকে তাদের রাষ্ট্রের অংশ মনে করেনি, মনে করেছে তাদের উপনিবেশ । এর প্রমাণ, পাকিস্তানের মোট জনগোষ্ঠীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ (প্রায় ৫৬%) পূর্ব পাকিস্তানে বাস করা সত্ত্বেও রাজধানীসহ কেন্দ্রীয় সরকারের সকল বিভাগ, রাষ্ট্রীয় ব্যাংক এবং সরকারি বেসরকারি অন্যান্য আর্থিক ও বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার প্রধান কার্যালয় পশ্চিম পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেশ পরিচালনার মূল ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে থাকে। প্রেসিডেন্ট ও প্রধান মন্ত্রী, বিভিন্ন বাহিনীর প্রধান, গুরুত্ত্বপূর্ণ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীত্ব থাকে অবাঙালি পাকিস্তানিদের হাতে। এছাড়া আয় বৈষম্য, সম্পদ পাচার, বৈদেশিক সাহায্য, শিল্পের উন্নয়নসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে বৈষমের শিকার হয় পূর্ব পাকিস্তান নামের আমার সোনার বাংলা।
পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ থেকে মুক্তির জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ৬ দফা কর্মসূচী ঘোষণা করেন। জাতির জনকের ৬ দফা শোষিত ও নির্যাতিত বাঙালির নিকট তাদের “ম্যাগনাকার্টা” বা “মুক্তিসনদ” রুপে গৃহীত হয়। জাতির জনকের কারিশমাটিক নেতৃত্ব এবং বাংলার সংগ্রামী ছাত্র সমাজের গতিশীলতায় অল্প সময়ের মধ্যেই এই কর্মসূচীকে সকল স্তরের বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বলিষ্ঠ ঘোষণায় পরিণত হয়।
১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারী থেকে ১১ দফা দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করে। ঐ দিন ছাত্র সংগ্রাম কমিটি হরতাল এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় সভা আহবান করে। একই দিনে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম কমিটিও পল্টন ময়দানে সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচী গ্রহন করে। এই কর্মসুচী চলাকালে পুলিশের সাথে ছাত্র জনতার সংঘর্ষ বাধে। এতে জনমনে ভীষন ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ১৮ জানুয়ারী প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়। এদিনও পুলিশি নির্যাতনে বহু ছাত্র আহত ও গ্রেফতার হয়। এ আন্দোলন ২০ জানুয়ারী চরমে পৌছায়। এদিন হাজার হাজার ছাত্রের মিছিল রাস্তায় নামলে পুলিশ মিছিলের উপর গুলিবর্ষন করে। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদ শহীদ হয়। আসাদের মৃত্যুতে গণজাগরনের বিস্ফোরণ ঘটে। ২১ জানুয়ারী ঢাকা শহরে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। ২২ ও ২৩ জানুয়ারী প্রতিবাদ মিছিল হয় এবং ২৪ জানুয়ারি ঢাকা শহরে সাধারণ হরতালের ডাক দেয়া হয়। ২৪ জানুয়ারি সকাল থেকেই ছাত্রসহ লক্ষ লক্ষ শ্রমিক, শহরের দরিদ্র ও মেহনতি মানুষসহ সকল পেশার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। হরতাল সম্পূর্ণরূপে সফল হয়।
ঊনসত্তরের গণঅভ্যূথানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী আইয়ুব খানের পতন হলে জেনারেল ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগন একচাটিয়াভাবে ৬ দফার পক্ষে রায় প্রদান করে। আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনের পর শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রনয়নের দলের অভিমত জানিয়ে দেন এবং এ ব্যাপারে অনড় থাকেন। ইয়াহিয়া খান, ভূট্রো সাহবের প্ররোচণায় আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নানা তালবাহানা শুরু করেন এবং গোপনে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য আমদানী করতে থাকেন। ইয়াহিয়া ১৯৭১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষনা করেন, ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে। কিন্তু ভূট্রোর সাথে গোপন বৈঠকের পর ১ মার্চ ইয়াহিয়া ৩ মার্চের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। ইয়াহিয়ার এই ঘোষনায় সারা দেশে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঝড় উঠে। শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রতিবাদে ২ ও ৩ মার্চ ঢাকায় হরতাল এবং ৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে জনসভার ঘোষনা দেন। ২ ও ৩ মার্চ ঢাকায় হরতাল সফল হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্সের ময়দানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের জনসভায় ঘোষনা করলেন “...এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম...”। ৭ মার্চের ভাষণ সারা দেশের মানুষকে রোমাঞ্চিত করে তোলে। তাঁর এ ভাষণ মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস বাঙালির মনে সংগ্রামী প্রণোদনা যোগায়।
২৫ মার্চ মধ্যরাত্রি হতে বাঙালির উপর শুরু হয় ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বর্বরতম গণহত্যা অভিযান। বাঙালিরাও এ গণহত্যা অভিযানের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ঐ রাতেই জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। তবে তিনি পাক-হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হবার পূর্বে ২৫ মার্চ রাত্রি ১টা ১০ মিনিটে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে সর্বতোভাবে মোকাবেলার আহবান জানান। ২৭ মার্চ চট্রগ্রামের কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষনা পাঠ করেন। এই যুদ্ধ দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলে। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ তাজা প্রাণের বিনিময়ে আসে আমাদের স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর অধিনায়ক লেঃ জেনারেল আমির আবদুল্লাহ নিয়াজী তার ৯৩ হাজার সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্রসহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথ কমান্ডের প্রধান জগজিৎ সিং অরোরা ও বাংলাদেশ বাহিনীর পক্ষে উপ প্রধান এ. কে. খন্দকারের উপস্থিতিতে আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর করেন। দীর্ঘ ২৪ বছরের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ বাঙালির রক্তদান ও মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের উদ্ভব হয়।
সীমাহীন ত্যাগ, শ্রম, রক্ত, ঘাম ও সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রাণের ভাষা ও স্বাধীনতা। সেই ভাষা শহীদ ও সংগ্রামীদের এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদ ও সংগ্রামীদের আমরা বিভিন্ন আয়োজনে স্মরণ করি। তবে ভাষা আন্দোলনের শহীদ সংগ্রামীদের বিষয়ে আমাদের স্মরণ একটু ভিন্নতর। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই থাকে শহীদ মিনার। সরকারী উদ্যোগে অথবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বউদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করে শহীদ মিনার। একুশে ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহর থেকেই শুরু হয় শ্রদ্ধা নিবেদন। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা সকালে নিজ নিজ শিক্ষালয়ের শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানিয়ে র‌্যালি করে। কিন্তু স্বাধীনতার সংগ্রামীদের শ্রদ্ধা জানাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় না। বিজয় দিবস বা স্বাধীনতা দিবসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে এসে কুচকাওয়াচ সহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়ে থাকে। সরকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দিবসগুলোর প্রথম প্রহরে তোপধ্বন্নিসহ জেলা বা থানায় স্থাপিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাজধানীর মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন স্মৃতিসৌধে গিয়ে বা প্যারেড গ্রাউন্ডে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মত স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনটা কেমন যেন খাপছাড়া মনে হয়। 
আমার প্রস্তাবনা হচ্ছে, ভাষা শহীদদের জন্য প্রায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই যেমন শহীদ মিনার রয়েছে ঠিক তেমনি ভাবে মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেও প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকা প্রয়োজন। এখন কথা হলো, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুটি শহীদ মিনার গড়া কতোটা যুক্তিযুক্ত বা কেমন হবে? এব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছা খুবই জরুরী। সরকার চাইলে আমাদের দেশের প্রথিতযশা শিল্পীদের, স্থপতিদের বা সকল শিল্পী-স্থপতিদের কাছ থেকে একটা সমন্বিত নকশা আহবান করতে পারেন। যে নকশায় একটি শহীদ মিনার হবে ভাষা শহীদদের ও মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানোর মত সমন্বিত শহীদ মিনার। একটি স্মৃতিস্তম্ভে ফুটে উঠবে দুটি মহান ত্যাগ ও গৌরবের ইতিকথা। সরকার চাইলে এটা সরকারি উদ্যোগে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তৈরী করে দিতে পারে। বিশেষ করে সরকারি সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে করে দিবে এবং বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নকশা সরবরাহ, আর্থিক সহযোগীতা করতে পারে। এতে করে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিষ্ঠানের স্মৃতিস্তম্ভটি দেখে একই সাথে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে এবং নির্ধারিত দিবসে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবে। আমাদের ভাষা আন্দোলনের ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ত্যাগ, গৌরবগাথা মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে থাকুক আজন্ম, এটাই হোক সরকারের সু-প্রচেষ্টা, আমাদের প্রাপ্তি। 

বালিকা-২


বালিকা তুমি আমার হবে কবে
আমি যখন তোমার হবো, তবে?
আমিতো তোমারই হয়ে আছি
তোমায় নিয়েই স্বপ্ন দেখে বাঁচি।

বালিকা তুমি আমায় বুঝবে কখন
ভালোবেসে জীবন দিলে, তখন?
ডুবেছি তোমার প্রেম সাগরে পরে
আমিতো সেই কবেই গেছি মরে।

বালিকা তোমায় বুঝাই কেমন করে
আমার মনে যতটা প্রেম ধরে
তারচেয়েও বেশি ভালোবাসি
বারবার আমি তাইতো ফিরে আসি।

জানোয়ারও কী এত নীচ হতে পারে!

আমার খুব কুকুর পোষার সখ। ছোটবেলা থেকেই এই সখটা ছিলো এখন বড়বেলায়ও আছে। আগে আমাদের কাচা পিড়ার ঘর ছিলো। যখন স্কুলে পড়তাম তখন কুকুর ছানা এনে ঘরের পিড়া খুড়ে গুহা বানিয়ে রাখতাম। বড় হলে কোনটা রোগে আক্রান্ত হয়ে বা বয়সের কারনে মারা যেত। আবার আনতাম, লালন পালন করতাম। তবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লড়ে যেতাম, পশু হাসপাতালে নিয়ে যেতাম, চিকিৎসা করাতাম, মৃত্যু শেষে মাটি দিয়ে রাখতাম। হৃদয়ে তখন বেশ ব্যথা অনুভব করতাম। কুকুরের প্রতি আমার ভালোবাসা দেখে বাড়ির সবাই অপছন্দ করলেও আমাকে ভালোবাসে বলে সহ্য করতো। সেই পোষা কুকুর যদি কেউ বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে তখন কেমন লাগে? সেটা যদি প্রাপ্ত বয়স্ক না হয়ে ছোট্ট বাচ্চা কুকুর ছানা হয়, যে কিনা সারাদিন পায়ের কাছে ঘুরঘুর করে, খাবার দেখলে নাচানাচি করে, একটু আদরের আশায় পায়ের কাছে গড়াগড়ি খায়, সেই কুকুর ছানাটা যদি কোন মানুষরূপি পশু বিষ খাইয়ে মেরে ফেলে তখন হৃদয়ের অবস্থাটা কেমন হয় ভাবাযায়? তাদের পশু বা জানোয়ার বলা যায় কিনা আমি জানি না। কারন জানোয়াররা কি এতটা অমানবিক-হিংস্র হয়?
আমার বন্ধু ডাক্তার মাহবুবুল হকের বাড়িতে একটা মেয়ে কুকুরের বাচ্চা আসছিলো অনেকদিন আগে। শত চেষ্টায়ও যখন তাড়াতে পারেনি তখন ওটা ওখানেই বড় হতে থাকলো। আস্তে আস্তে কুকুরটি তার প্রভূভক্তির প্রমান দিলো যাকে ওরা টমি ডাকতো। প্রথমে অবজ্ঞা করলেও টমি সকলের ভালোবাসা আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছে। এবছর টমি পাঁচটি ছানা পোষব করেছে এবং পাঁচটিই পুরুষ। আমি একটা নেয়ার আগ্রহ দেখালে একটু বড় হওয়ার পর নেয়ার জন্য বললো। আমি দেখে লাল একটা ছানা নিয়ে নিলাম। গায়ের রং লাল হওয়ায় বাড়ির সবাই লালু বলেই ডাকে। লালু লালু ডাকায় ও বুঝে গেছে ওর নাম লালু। লালু বলে ডাক দিলেই সে দৌড়ে এসে হাজির হয়। আমি লালুকে এনে যতটা না খুশি হয়েছি তার চেয়ে বেশি খুশি আমার মেয়ে প্রিয়ন্তী, বড় ভাতিজা পাপন আর একদম ছোট ভাতিজা রাফান। ভাবি ও আমার স্ত্রী অপছন্দ করলেও খাবার দাবার দিতে কখনো কার্পন্য করেনি। লালুর জন্য হাড়-কাটাতো আছেই, ভাত মেখে লালুর নির্দিষ্ট প্লেটে ঠিকই দিতো। 
কুকুর সর্বদা প্রভূ ভক্ত প্রাণী এটা নতুন কিছু নয়। কথিত আছে কুকুর হলো সর্ব প্রথম মানুষের পোষমানা কোন প্রাণী। প্রভূর জন্য কুকুরের মমত্ববোধ নিয়ে অনেক ঘটনা আছে যা লিখে শেষ করা যাবে না। আমার পোষা লালু অল্প ক’দিনে কতটা প্রভূভক্ত হয়েছিলো তার কিছু ঘটনা বলি। আমি রাতে বা দিনে যখনই বাড়ি ফিরি অন্তত দুশ মিটার দুর থেকে আমার মোটরসাইকেলের আওয়াজ পেয়ে বাড়ি থেকে এক দৌড়ে রাস্তায় চলে আসে। এর পর রাস্তা থেকে আমার সাথে বাড়ি ঢুকতো। আমি কবুতর পোষতে পছন্দ করি। আমার কবুতরকে কাকে আক্রমন করলে লালু কাকের উপর ঝাপিয়ে পড়তো এবং চিৎকার চেচামেচি করতো যাতে আমরা বুঝতে পারি যে কোন বিপদ ঘটেছে। এমন ঘটনা অনেক যা হয়তো যারা কুকুর পোষেন তাদের ঘটনার সাথে মিলে যাবে। 
তিন মাস পূর্বে লালুকে আমি বাড়িতে আনি। প্রথম প্রথম কয়েকদিন খুব কান্নাকাটি করতো। কান্নাকাটির অবশ্য অন্যতম কারন হলো রশি দিয়ে বেধে রাখা! বাড়িটা যখন ওর কাছে পরিচিত হয়ে গেছে তখন ছেড়েই দিয়েছিলাম। দরজার সিড়ির গোড়ায় শুয়ে থাকতো, কখনো পুকুর পাড়ে রোদের মধ্যে শুয়ে শুয়ে ঘুম দিতো। আমাকে দেখা মাত্র দৌড়ে পায়ের কাছে চলে আসতো। লালু একটু নবাবী স্বভাবের ছিলো। ডাল ভাত তার মুখে রুচতো না। মাংস ছাড়া সে ভাতও খেতে চাইতো না। তাই মাংসের ছাডি (মাংসের চর্বি-উচ্ছিষ্ট) লালুর জন্য রান্না করে দিতো আমার বড় বোন। সেই মাংসের ছাডি বক্সে ভরে ফ্রিজে রেখে দিতাম। ওখান থেকে নিয়ে ভাত মেখে দিতাম। লালু একটু রিষ্টপুষ্ট হয়েছে। গলা ছেড়ে ডাক দিতে শিখেছে। অপরিচিত কেউ বড়িতে ঢুকলে ঘেউ ঘেউ করতে শিখেছে। বাচ্চারা যেহেতু কুকুর ছানা পছন্দ করে, তেমনি কুকুর ছানাও বাচ্চাদের পছন্দ করে। বাড়ির আশে পাশের ছোট বাচ্চারা এসে লালুকে খুব আদর করতো। মাঝে মাঝে বাচ্চাদের সাথে বাড়ির বাইরে চলেও যেত। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে ঠিকই চলে আসতো ওর নিজ গৃহে। আজ যে ঘটনা ঘটে গেলো সেটা আমার ধারনায়ও ছিলো না। এমন একটা ঘটনার জন্য আমি মানসিক ভাবে প্রস্তুতও ছিলাম না। 
আজ দুপুরে বাড়ি থেকে আমার বড় বোন ফোন দিলো। বাড়ি থেকে ফোন দিলে প্রথমেই আমার বুকটা একটু কেঁপে উঠে। আমাকে কেউ সাধারণত প্রয়োজন ছাড়া ফোন দেয় না, আমিও দেই না। আমার মা অসুস্থ থাকতে বাড়ির ফোন পেলে বুক কেপে ওঠা শুরু হয়। মা এখন আর নেই। এখন বাবা অসুস্থ ঘরে। ফোন পেলেই মনে হয় কোন বিপদ নয়তো? বোনের ফোন পেয়ে রিসিভ করেই জানতে চাইলাম কি ব্যাপার আপা। আপা ফোনে জানালো, লালুকে কারা যেন বিষ খাইয়েছে। লালু আপার দরজার কাছে দৌড়ে এসে কিছুক্ষণ দপাদপি করে, কাকুতি মিনতি করে দৌড়ে চলে গেছে, এখন আর তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। আপার কাছ থেকে ফোন নিয়ে আমার মেয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে একই কথা বললো। আমি বাড়ি যাওয়ার সাথে সাথে মেয়ে আমার কোলে উঠে গলা জড়িয়ে অঝরে কান্না করছে আর লালুর কথা বলছে। মেয়ের কান্না দেখে আমিও আবেগতাড়িত হয়ে গেলাম। পোশাক পরিবর্তন করে বেরিয়ে পড়লাম লালুর খোঁজে। আমার পিছু নিলো আমার মেয়ে আর বড় ভাতিজা পাপন। যেদিকে লালু ছুটে গেছে সেদিক দিয়ে খুঁজতে গিয়ে দেখি পাশের বাড়ির বাগানের মধ্যে লালুর নিথর দেহ পড়ে আছে। নাড়া দিয়ে দেখি লালুর শরীরে প্রাণের অস্তিত্ব নেই। লালুর এভাবে শুয়ে থাকা দেখে হৃদয়টা ভেঙ্গে গেলো। আমার মেয়ে ও ভাতিজা দুজনেই কেঁদে ফেললো। আমি লালুকে ওখান থেকে তুলে নিয়ে আসলাম বাড়িতে। নিজেই মাটি খুড়ে লালুর দেহটা মাটিচাপা দিয়ে দিলাম। লালুকে মাটিচাপা দিয়ে আমি দাড়িয়ে থাকতে পারলাম না। পাশের একটা গাছের গুড়ি ছিলো তার উপর বসে পড়লাম। আমার গলা শুকিয়ে আসছে। পাপন এক গ্লাস পানি এনে দিলো। আমার দুই বোন, ভাবি, স্ত্রী, ভাগ্নে দিপ্ত সবাই এসেছে আমার কাছে। সবাই হতবাক! আমাকে সান্তনা দিলো। সবাই আমার মতই হতবাক ও ব্যথিত।  
একটা ছোট্ট কুকুর ছানা। যদি কারো বাড়িতে গিয়ে থাকে, কারো অনিষ্ট করে থাকে তবে কতটাই বা করেছে, কতটাই বা করতে পারে? যদি কারো ক্ষতি করে থাকে তবে সবাইতো জানে যে লালুকে আমি লালন পালন করি, আমাকে বলতে পারতো। আমি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতাম। যদি দিতে না পারতাম আমি ক্ষমা চেয়ে নিতাম। একটা বোবা প্রাণী। তাও আবার বাচ্চা। ছোট শিশু সে যে প্রাণীরই হোক, মানুষ বা ভয়ংকর কোন প্রাণীর বাচ্চা, তাদের কি দেখতে ক্ষতিকর মনে হয়? লালুকে বিষ খাওয়ানোর আগে একবারও কি তাদের বুক কাপলো না? তারা কি মানুষ? লালুর মত একটা বাচ্চা পশুর মুখে বিষ তুলে দিলো যারা তাদের কি পশু বলা যায়? কি নামে ডাকবো তাদের? একটা পোষা প্রাণীকে বিষ খাইয়ে হত্যার অপরাধে আমি বিচার চাইতে পারতাম। আমি বিচার চেয়েছিও। আমি মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে বিচার চেয়েছি। আল্লাহ তায়ালা, আপনি ওদের ঈমান দিন যারা এমন কাজটি করেছে! আমি মাত্র তিন মাস লালন পালন করেছি তাতে আমার এতটা কষ্ট লাগছে, যে লালুকে সৃষ্টি করেছে সেই সৃষ্টিকর্তার কেমন লেগেছে যখন লালুর মুখে বিষ তুলে দিলো! নিশ্চই মহান সৃষ্টিকর্তা তার সৃষ্টির উপর অমানবিকতার উপযুক্ত বিচার করবেন। 

Thursday, February 7, 2019

ওজনে কম দেয়া, ঠকবাজি, প্রতারণায় দুনিয়া-আখিরাতে শাস্তি


মানে কম, গুনে কম, ওজনে কম, মাপে কম, আন্তরিকতায় কম, সেবায় কম। কমতে কমতে সবকিছুই কমে আসছে। সবকিছুতেই কম আর কম। কমতে কমতে মানুষের মূল্যবোধই কমেগেছে। তবে মূল্যবোধ কমলেও মূল্য সম্পর্কে বোধটা কমেনি। কখন মূল্য বাড়াতে হবে সেই বোধটা দাড়ি-টুপিধারী লেবাসী ব্যবসায়ীরও আছে। লেবাসহীনদের বিষয়ে আর কি বলবো? সুযোগ পেলেই মূল্য বাড়িয়ে ফেলে। এক্ষেত্রে আর কমায় না! এভাবে কমতে থাকলে মানুষ কেউ কারো প্রতি আর আস্থা রাখতে পারবে না। আমাদের মূল্যবোধ কমেছে এতটাই যে সবকিছুতেই কম দিয়ে, কম করে বেশি লাভ করতে চাইছি।
ওজনে কম দেয়া, সাইজে কম দেয়া আমাদের অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেছে। কোন প্যাকেটজাত পন্য কিনতে গেলে দেখা যায় পঞ্চাশ থেকে ক্ষেত্রভেদে একশ গ্রাম পর্যন্ত কম হয়। পানি কিনতে গেলে সেখানেও কম পাওয়া যায়। জীবন রক্ষাকারী ঔষধে উপাদান কম দেয়ার মতো ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। মাটির তৈরী ইট। সেই্ ইট সাইজে কম দিয়ে মানুষকে ঠকানো হচ্ছে। ঠকানোটা এমন পর্যায়ে পৌছে গেছে যে গাঁজাও পরিমানে কম দিচ্ছে। হাল আমলে সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যাবলেট ইয়াবায়ও ভেজাল দেয়া হচ্ছে। শোনাযায় জন্মনিয়ন্ত্রনে মায়া বড়িও ইয়াবা বলে চালিয়ে দেয়ার ঘটনা ঘটছে, কেউ কেউ নিজেই বাড়িতে বড়ি বানানোর প্রেশার মেশিন বসিয়ে নিয়েছে! জাতা দিলেই ট্যাবলেট!
সম্প্রতি এমন কিছু কম দেয়ার ঘটনা আলোচিত হয়েছে। কুমিল্লার এক গাঁজা ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকায় দেয়ার কথা ছিল তিন কেজি গাঁজা। কিন্তু এক মাদক ব্যবসায়ী তাকে দিল মাত্র এক কেজি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি ফোন দিলেন পুলিশের জরুরি সেবা '৯৯৯'-এ। পুলিশ এসে গাঁজাসহ তাকেই গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে। অবিশ্বাস্য এ ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার ব্রাক্ষণপাড়া বাজারে। তবে পুলিশের উপর যে আস্থা বেড়েছে গাঁজা ব্যবসায়ীর এটা খুব আশাব্যঞ্জক! শরীয়তপুরে ইট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে ধরা পড়েছে পরিমানের জালিয়াতি। ক্রেতারা প্রতি হাজার ইটে কমপক্ষে ২শ ৮৪টি সমপরিমাণ ইট কম পাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যেকটি ইটের ভাটায় প্রস্তুতকৃত ইটের সাইজ রয়েছে দৈর্ঘ্যে ২২ সেন্টিমিটার, প্রস্থে ৯ দশমিক ৬ সেন্টিমিটার এবং উচ্চতায় ৫ সেন্টিমিটার। সরকারি বিধি মোতাবেক প্রতিটি ইটের সাইজ হবে দৈর্ঘ্যে ২৪ সেন্টিমিটার, প্রস্থে ১১ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার এবং উচ্চতায় ৭ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ প্রত্যেকটি ইটে কমপক্ষে ২ সেন্টিমিটার করে কম রয়েছে। চালের বাজারেও চলে কমের ঘটনা। এক ব্যক্তি দুই মন চাল কিনে দেখে দুই মণের বস্তায় চাল আছে ৭৭ কেজি, অর্থাৎ তিন কেজি কম।
পরিমানে যদি কেউ কম দেয় তবে ক্ষতিগ্রস্থ বা প্রতারিত ব্যক্তির আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ধরনের অপরাধের জন্য দণ্ডবিধির ২৬৪, ২৬৫,২৬৬ ও ২৬৭ ধারা অনুসারে নিকটস্থ মুখ্য মহানগর হাকিম ও মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালতে ফৌজদারি মামলা করা যাবে। সেক্ষেত্রে প্রতিকার পাবেন কিভাবে?
ফৌজদারি আদালতে মামলা করার ক্ষেত্রে অভিযোগ দায়ের করতে হয়। সে অভিযোগ শুনে আদালত অভিযোগ থাকা ব্যক্তিকে আদালতে হাজিরের নির্দেশ দিতে পারেন। সে নির্দেশ মোতাবেক হাজির না হলে, সে ক্ষেত্রে বিচারক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন।
দণ্ডবিধির ২৬৪ ধারায় ‘ওজনের জন্য প্রতারণামূলকভাবে মিথ্যা যন্ত্র ব্যবহার’ করার বিষয়ে বলা আছে। এ ধারা অনুসারে কোনো ব্যক্তি যদি প্রতারণামূলকভাবে ওজনের জন্য এমন কোনো যন্ত্র ব্যবহার করেন, মিথ্যা বলেন- তবে সেই ব্যক্তি এক বৎসর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অর্থ দণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হবেন।
দণ্ডবিধির ২৬৫ ধারা অনুসারে ‘প্রতারণামূলকভাবে মিথ্যা ওজন কিংবা মাপ ব্যবহার’ করার বিষয়ে বলা আছে। এ ধারা অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি প্রতরণামূলকভাবে কোনো মিথ্যা ওজন কিংবা দৈর্ঘ্যের বা ধারণশক্তির মাপকে উহা অপেক্ষা ভিন্ন ওজন কিংবা দৈর্ঘ্য বা ধারণশক্তির মাপ হিসেবে ব্যবহার করেন, তবে সেই ব্যক্তি এক বৎসর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা অর্থ দণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হবেন।
দণ্ডবিধির ২৬৬ ধারা অনুসারে, ‘মিথ্যা ওজন কিংবা মাপ করা’ বিষয়ে বলা আছে। এ ধারা অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো ওজন, পরিমাপ যন্ত্র বা বাটখারা কিংবা দৈর্ঘ্য বা ধারনক্ষমতা মাপবার যন্ত্র রাখে, যা মিথ্যা বলে সে জানে এবং উহা যাতে প্রতারণামূলকভাবে ব্যবহৃত হতে পারে তার জন্যই রাখে, তবে সেই ব্যক্তির এক বৎসর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম অথবা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে, অথবা অর্থ দণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হবেন।
দণ্ডবিধির ২৬৬ ধারা অনুসারে, ‘মিথ্যা বাটখারা কিংবা মাপ তৈরি কিংবা বিক্রয় করা’ বিষয়ে বলা আছে। এ ধারা অনুসারে, কোনো ব্যক্তি যদি এমন কোনো ওজন বা বাটখারা কিংবা দৈর্ঘ্য বা ধারনশক্তির পরিমাপ যন্ত্র তৈরি করেন, বিক্রয় করেন বা লেনদেন করেন, যা মিথ্যা বলে তিনি জানেন এবং উহা যাতে সত্য বলে ব্যবহার করা যায়, সে উদ্দেশ্যেই তা করেন অথবা উহা সত্য বলে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাহলে যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হবেন।
এতো গেলো আইনগত অধিকার আদায়ের বিষয়। ধর্মীয় অনুশাসন মানা ব্যক্তির জন্যও ওজনে, সাইজে কম দেয়ার, প্রতারণার অপরাধে পরপারে রয়েছে শাস্তির সু-ব্যবস্থা।
ওজনে কম দেয়া, ঠকবাজি, প্রতারণা একটি কবিরা গুনাহ। ইসলামের দৃষ্টিকোণে ঠকবাজি, প্রতারণা ও ওজনে কম দেওয়ার শাস্তি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে প্রতারণা ও প্রতারক, উভয়ের ব্যাপারে কঠোর নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন এবং তাদের জন্য অবধারিত ধ্বংসের ঘোষণা দিয়েছেন। এ সংক্রান্ত স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় পবিত্র কালামের এই আয়াতে : “ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের থেকে মেপে নেয়ার কালে পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করে। আর যখন তাদের জন্য মাপে বা ওজন করে, তখন কম দেয়।”[সূরা মুতাফফিফীন : ১-৩]
এ এক কঠিন ঘোষণা, যারা ঠগবাজি করে, মাপে ও ওজনে মানুষকে কম দেয় তাদের জন্য। সুতরাং যারা পুরোটাই চুরি করে, আত্মসাৎ করে, এবং মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তুতে ঠকায়, তাদের কী কঠিন অবস্থা হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়। মাপে ও ওজনে কমপ্রদানকারীর তুলনায় এরা আল্লাহ তাআলার শাস্তির অধিক ভাগিদার, এতে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
এমনিভাবে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতারণা থেকে সতর্ক করেছেন এবং প্রতারকের ব্যাপারে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাবারের এক স্তুপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তিনি খাবারের স্তুপে হাত প্রবেশ করালেন, তার আঙুলগুলো ভিজে গেল। তাই তিনি বললেন, ‘হে খাবারওয়ালা, এটা কি ? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, তাতে বৃষ্টির পানি পড়েছিল। তিনি বললেন, তুমি কি তা খাবারের উপরে রাখতে পারলে না, যাতে মানুষ তা দেখে ? যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ অন্য রেওয়ায়েতে আছে ‘যে আমাদের সাথে প্রতারণার আশ্রয় নেয়, সে আমাদের দলভুক্ত নয়’। অপর রেওয়ায়েতে আছে ‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে প্রতারণার আশ্রয় নেয়।’[ইমাম মুসলিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।]
প্রতারণার রয়েছে নানাবিধ ক্ষতি, তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: প্রতারণা মানুষকে জাহান্নামের পথে ঠেলে দেয়, নিক্ষেপ করে ভয়াবহ ও স্থায়ী আগুনে।, প্রতারণা ব্যক্তির আত্মিক নীচুতা ও মানসিক কলঙ্কের পরিচায়ক। সুতরাং চরম নীচু মানসিকতার অধিকারীই কেবল তা করে থাকে, এবং স্থায়ী ধ্বংসে পতিত হয়।, প্রতারক ক্রমে আল্লাহ ও মানুষ থেকে দূরে সরে যায়।, প্রতারণা দুআ কবুলের পথ বন্ধ করে দেয়।, প্রতারণা সম্পদ ও বয়সের বরকত ধ্বংস করে দেয়।, ঈমানের দুর্বলতা ও কমতির পরিচায়ক।, অব্যাহত প্রতারণা ও জালিয়াতী প্রবণতার ফলে প্রতারক গোষ্ঠীর উপর যালিম ও কাফিরদেরকে চাপিয়ে দেয়া হয়।

তাই ওজনে কম দেয়ার, ঠকবাজির, প্রতারণা করার আগে একবার হলেও ভাবুন। কেন করছেন এসব? একটু বেশি লাভের আশায়, একটু ভালো থাকার আশায়তো? মানুষের জীবনধারণের জন্য খুব বেশি অর্থ-সম্পদ প্রয়োজন হয় না। আর বেশি অর্থ উপার্যন করে কার জন্য রেখে যাবেন? যাদের জন্য রেখে যাবেন তারা কেউ এই অপরাধের জন্য শাস্তির ভাগ দুনিয়াতে যেমন নিবে না তেমনি পরপারেও আপনাকে স্বীকার করবে না। তাই সাবধান হওয়ার সময় থাকতে হওয়া উচিত।

Tuesday, February 5, 2019

বালিকা-১

বালিকা তোমার দুরন্ত ছোটাছুটি
খিলখিলিয়ে হাসির লুটোপুটি
বালিকা তোমার বাঁকা ঠোটের হাসি
দেখতে আমি অনেক ভালোবাসি।
বালিকা তোমার অকপটে কথা বলা
খুনসুটি আর ছোট ছোট ছলা কলা
বালিকা তোমার আকাশ পানে চাওয়া
আমার কাছে আকাশ হাতে পাওয়া।
বালিকা তোমার ছি-কুতকুত খেলা
বৌয়াছি আর গোল্লাছুটে যায় বেলা
বালিকা তুমি এসব কর যখন
তোমায় আমি ভালোবাসি তখন।
বালিকা তুমি শিখবে কখন পড়া
হৃদয় বুঝে হৃদয়টাকে ধরা
বালিকা আমি আছি প্রতিক্ষাতে
কখন রাখবে হাতটি আমার হাতে?