ভালবাসি প্রকৃতি

ভালবাসি প্রকৃতি

Thursday, May 21, 2015

অতীত ঐতিহ্যের কাশ-পিতল শিল্প: আজ শিল্পীও নেই শিল্পও নেই

এক সময় শরীয়তপুর জেলার বিশেষ করে সদর উপজেলার পালং, বিলাশখান, বাঘিয়া, দাসার্তা গ্রামে প্রবেশ করলে মানুষ কান হাত দিয়ে দু’কান বন্ধ করে হাটতো। কাশ-পিতল কারিগরদের পিতল পাতের উপর অবিরাম হাতুরির বাড়িতে হওয়া টুং-টাং শব্দ কানে তালা লাগাতো অনেকের।

এটা আমাদের কাছে এখন কেবলই স্মৃতি। কারন সেই অতীত ঐতিহ্যের কাশ-পিতল শিল্পীও নেই, নেই শিল্পও। নানা সমস্যার কারনে, নানা সমস্যার অযুহাতে, নানা অভিযোগে দেড়শ বছরের ঐতিহ্যবাহী এ এলাকার পিতল শিল্প আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এক সময় ৫ শতাধিক পরিবারে ২ হাজারের উপরে কর্মী কাজ করলেও এখন ৭/৮টি পরিবারে ২০/২৫ জন শিল্পী এ শিল্প ধরে রেখেছে। এ শিল্পের প্রকৃত শিল্পী যারা তারা চলে গেছেন ওপার বাংলায়। এপারে যারা এই শিল্পকে আকরে ধরে আছেন তারা জাত শিল্পী না। জাত শিল্পীদের কাছে একসময় রুটি-রুজির জন্য কাজ করেছে বা শিল্পকে ভালবেসে কাজ শিখেছে তারাই ধরে রেখেছে শিল্পকে।
একেবারে গোড়ার কথা: জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে গবেষণা করেন এমন ব্যক্তি ও শিল্পের সাথে জড়িতদের সাথে আলাপ করে জানাযায়, অষ্টাদশ শতাব্দির শেষ দিকে কাশ-পিতল শিল্পের সাথে জড়িত কংসবণিক সম্প্রদায় প্রথমে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে পশ্চিম বঙ্গের হুগলির চন্দন নগর এসে বসতি গড়ে। সেখান থেকে একটা অংশ বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জের লৌহজং গ্রামে এসে বসতি গড়ে। পদ্মা নদীর ভাঙ্গনের ফলে লৌহজং থেকে কংসবণিক সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ অংশ শরীয়তপুরের দাসার্তা, বাঘিয়া, পালং, বিলাশখান গ্রামে এসে বসতি গড়ে কারখানা স্থাপন করে। শরীয়তপুর সদরে তথা পালং ছাড়াও জেলার অন্যান্য উপজেলাতে বসতি গড়লেও সংখ্যায় তা কম। তবে পালং বাজারটাই ব্যবসার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠে।
শিল্পের প্রসার: বাঘিয়া, দাসার্তা, বিলাশখান ও পালং গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে কারখানা গড়ে উঠলেও পালং বাজার প্রধান ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তৎকালীন সময়ে কাশ-পিতলের ধাতব মূল্য ও সৌন্দর্যের কারনে এ শিল্পের এতটাই প্রসার লাভ করে যে, বাংলাদেশের মধ্যে পালং হয়ে ওঠে কাশ পিতল শিল্পের প্রধান উৎপাদন ও ব্যবসা কেন্দ্র। এখান থেকে দেশের প্রধান বিভাগীয় শহর এবং বিভাগীয় শহর থেকে বিদেশে রপ্তানি হওয়া শুরু হয়। এই শিল্পের প্রসার প্রথমে হিন্দুদের হাতে শুরু হয়। পরবর্তীতে মুসলমানরাও জড়িয়ে পরে এ শিল্পের সাথে।
পেশার সাথে যুক্ত পরিবারের অতীত ও বর্তমান সংখ্যা: গত ২০/৩০ বছর পূর্বেও এ শিল্পের সাথে ৪ শতাধিক পরিবার জড়িত ছিল। এখানে কাশ-পিতল শিল্পের প্রায় ২ থেকে ৩ শতাধিক কারখানা গড়ে উঠেছিল। পর্যায়ক্রমে মুসলমানরা এ শিল্পে শ্রম দিতে দিতে কারিগর হয়ে ওঠে। নানাবিধ কারনে শিল্পের সাথে জড়িত হিন্দুরা ভারতের পশ্চিম বঙ্গে চলে যেতে থাকলে মুসলমান কারিগররা আস্তে আস্তে কারখানা স্থাপন করে শিল্পটা ধরে রাখে। বর্তমানে জেলায় ৭/৮টি পরিবার এ শিল্পকে ধরে রেখেছে। এক সময় শুধু পালং বাজারেই ৩০ থেকে ৪০টি কাশ-পিতল সামগ্রী বিক্রির দোকান থাকলেও এখন মাত্র ৪টি দোকান আছে।

শিল্প সামগ্রী: একসময় এ জেলায় মালা, কলসি, জগ, বালতি, বদনা, চামচ, পানদান, ডাবর, পানি খাবার গ্লাস-মগ, ধান-চাল পরিমাপের পুড়, কুপি, বিভিন্ন প্রকার প্রদীপ, পাতিল, ঘন্টি, বিন্দাবনী, চারা, কড়াই, ধুপদানী, ছোট ঘটি (পুঁজার জন্য), মালসা, কোসা-কুসি, পুস্প পত্র, করাতথাল, বাস বেড়া, বগি থাল, পঞ্চপত্র সহ নিত্যব্যবহার্য ও নানান দর্শনীয় সামগ্রী তৈরী করা হতো।
ওপারে (পশ্চিম বঙ্গে) চলে যাওয়ার কারন: নানা সময়ে রাজনৈতিক পট পরিবর্তণের কারনে বিনিয়োগের ও জীবনের নিরাপত্তাহীনতা, চাঁদাবাজি, সহজলভ্য সামগ্রী হাতে পেয়ে মানুষ পিতলের সামগ্রী ব্যবহার না করার কারনে এ শিল্পের সাথে জড়িত হিন্দুরা দেশ ছাড়তে থাকে। কাশ-পিতল শিল্পীরা সাধারণত অন্য কাজ করতে না পারায় পশ্চিম বঙ্গে এ শিল্পের চর্চা কিছুটা অব্যাহত থাকায় হিন্দুরা চলে যায়। আবার অনেকের মতে হিন্দুরা বাংলাদেশকে নিজের মত করে ভাবতে পারে না তাই তারা সর্বদা ওপার যাওয়ার চিন্তায় বিভোর থাকে। পশ্চিমবঙ্গে আপনজন থাকায় মনের টানে চলে যায় অনেকে। অনেকের মতে সংকট আছে থাকবেই। মুসলিম পরিবার গুলো তাদের পেশার সংকটের কারনে কি অন্যত্র চলে যাবে? সংকটের সাথে লড়াই করেই টিকে থাকতে হয়, টিকে থাকতে হবে। তাই শিল্প ধ্বংসের পিছনে শুধু সংকট, সন্ত্রাস, নিরাপত্তাহীনতা, বাজার মূল্য, সামাজিক প্রোপটকে দায়ী করলে ঠিক হবে না।    
শিল্প বিলুপ্তর কারণ: পালং বাজারের কাশ-পিতল ব্যবসায়ীরা জানান, একসময় কাশ-পিতল সামগ্রী তৈরীর কাঁচামাল ‘পাত’ কেজি ছিল ৮০ টাকা। আর এখন প্রতি কেজি পাতের দাম ৩০০ টাকা। এতেই অনুমান করা যায় কাঁচামালের মূল্য কি হারে বেড়েছে। বাজারে প্লাস্টিক, সিরামিক, মেলামাইন, সিলভার, এমনকি লেহার তৈরী পারিবারিক কাজে ব্যবহৃত সামগ্রীর সহজ লভ্যতা, কম মূল্যর কারনে এবং কাশ-পিতলে তৈরী সামগ্রীর অধিক মূল্যের কারনে মানুষ কাশ-পিতল সামগ্রী ব্যবহারে অনিহা দেখায়। ফলে শিল্পীরা তাদের উৎপাদনের উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কাশ-পিতলের ধাতব মূল্য, স্থায়ীত্ব বিবেচনা না করেই সহজলভ্য সামগ্রী ব্যবহারের কারনে এ শিল্প বিলূপ্তপ্রায়। তাছাড়া কাশ-পিতলের তৈরী সামগ্রীর চেয়ে সিলভার, প্লাস্টিক, সিরামিক, মেলামাইন, লোহার সামগ্রী দেখতে অনেক দৃষ্টিনন্দন।
চাহিদা: এক সময় মানুষ আচার-অনুষ্ঠানে উপহার দিতে বা পারিবারিক কাজে ব্যবহার করতে প্রধান ও প্রথম পছন্দের তালিকায় ছিল কাশ-পিতল সামগ্রী। কাশ-পিতল সামগ্রী ছিল আভিজাত্যের প্রকাশও। বর্তমানে মেলামাইন গিফট বক্স জাতীয় জিনিসের ছড়াছরি ও সহজলভ্যতার কারনে মানুষ কাশ-পিতল সামগ্রী উপহার তালিকা থেকে বাদ দেয়। এখন একান্ত ব্যবহার্য কিছু সামগ্রী যেমন, বিন্দাবনী, বালতি, কলস, পানদান ছাড়া আর কোন সামগ্রীর চাহিদা নেই।
বর্তমান পরিস্থিতি: বর্তমানে ৭/৮ পরিবার এ শিল্পকে কোনমতে বাঁচিয়ে রেখেছে। ৭/৮ টি পরিবারের মধ্যে হিন্দু পরিবারের সংখ্যা নেই বললেই চলে। পূর্বে যারা এ শিল্পে শ্রম দিতেন তারাই মূলত এ শিল্পকে ধরে রেখেছে। নতুন প্রজন্মের কেউ এই শিল্পে শ্রম দেয় না। ফলে এই ৭/৮ পরিবার বিলুপ্ত হলে বা পেশা ছেড়ে দিলে নতুন প্রজন্ম এই শিল্পের হাল ধরবে না বলেই পর্যবেক মহলের এবং শিল্পের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীদের ধারনা।
মুসলমান শিল্পীদের আবির্ভাব: একটা সময়ে পাঁচশতাধিক পরিবার এ শিল্পের সাথে জড়িত ছিল। প্রচন্ড চাহিদার কারনে শ্রমিক সংকট মেটাতে কংসবণিক সম্প্রদায় স্থানীয় মুসলমান শ্রমিকদের এ কাজে নিয়োগ দেয়। কালক্রমে এখান থেকে হিন্দু ব্যবসায়ীরা চলে যাওয়ায় এখন মুসলমানরা যে চহিদা আছে তা মেটানোর চেষ্টা করছে। এ শিল্প ধরে রাখার কারণ হিসেবে জানা যায়, মুসলমান শিল্পীরা এ কাজ শিখার কারনে অন্য কাজ পারে না। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা পশ্চিম বঙ্গে চাহিদা থাকায় এবং সেখানে অধিকাংশের আত্মীয় পরিজন থাকায় চলে গেলেও মুসলমানরা যাবে কোথায়। তাই তারা এখানে এই পেশাকে ধরে রেখেছে।

শিল্পীদের কথা: দাসার্তার শিবের বাড়ি চেনেন না এমন লোক শরীয়তপুরে খুব কমই পাওয়া যাবে। ঐ শিবের বাড়ি এক সময় ১০টি পরিবার এ কাজের সাথে জড়িত ছিল। বর্তমানে একটি মাত্র পরিবার কাজ করে বাকি সবাই পশ্চিম বঙ্গে চলে গেছে। রঞ্জীত কুমার কংসবণিক, সিদাম কংসবণিক, বাসুদেব কংসবণিক ও স্যামসুন্দর কংসবণিক এ চার ভাই এখনও এ শিল্পকে ধরে রেখে এদেশে পরে আছে। রঞ্জিত কুমার কংসবণিক বলেন, ভোর রাত থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে কাজ হতো। হাতুরি-পিতলের এতই সম্পর্ক ছিল যে টুং-টাং শব্দ সাধারণ মানুষের কাছে কানে তালা লাগার মত মনে হলেও আমাদের কাছে এটা গানের মতো। এখন আর এ শব্দ শোনা যায় না। আবুল কাশেম বেপারী বলেন, ছোট বেলায় এ শিল্পের চাহিদা এতই বেশি ছিল যে বাবা অন্য কাজে না দিয়ে কাশ-পিতলের কাজে দিলেন। এ কাজ শিখেছি এখনতো আর অন্য কাজ পারি না। তাই ধরে রেখেছি। বর্তমান অবস্থা এতটাই খারাপ যে, আগে এখানকার আফিদ ট্রেড ইন্টারন্যাশনালে প্রতি সপ্তাহে ২ থেকে ৩ টন কাঁচামাল বিক্রি হতো আর এখন ১ টন মাল ১ মাসেও শেষ হয় না। এতেই বোঝেন অবস্থাটা কি।

শিল্পীদের দাবী: বর্তমান পিতল শিল্পের সাথে জড়িত শিল্পীরা দাবি করেন এ শিল্পের বিকাশের জন্য তাদের সহজ শর্তে ঋণ ও বাজারজাতকরণের পরামর্শ প্রদান করা দরকার। তাছাড়া সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের দাবি ‘পিতল এমন একটি দ্রব্য এটা পুরাতন হলেও এর মূল্য খুব একটা কমে না। তাই পিতল ব্যবহার করুন। পিতল স্বাস্থ্যসম্মত ও পরিবেশ বান্ধব।’

কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কথা: জেলার পিতল শিল্পের কাঁচামাল প্রকৃয়াজাত প্রতিষ্ঠানের পথিকৃত শরীয়তপুর ব্রাস ইন্ডাষ্ট্রি এর প্রতিষ্ঠাতা আলহাজ্ব নুর মোহাম্মদ কোতোয়াল। বর্তমানে উৎপাদন ও সরবরাহকারী মেসার্স আফিদ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ সাদিকুর রহমান কোতোয়াল লিটন বলেন, কাঁচামালের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি, কাঁচামাল ভারতে পাচার হয়ে যাওয়া এবং শিল্পীরা ভারতে চলে যাওয়ায় মিলটি বন্ধপ্রায়। ১৯৮৭ সালেও এখানে কাঁচামালের চাহিদা এত বেশি ছিল যে এখানে কারখানা স্থাপন করতে আগ্রহী হয়েছিলাম। মাত্র ১৫/১৬ বছরের ব্যবধানে দেখা গেল চাহিদা শুনের কোঠায়। শিল্প ও শিল্পী উভয়ই বিলুপ্তপ্রায়।

বিসিকের ভাষ্য: বিসিক শিল্প নগরী শরীয়তপুর এর এক সম্প্রসারণ কর্মকর্তার সাথে কথা বল্লে তিনি জানান, দশ বছর আগে যখন এখানে একবার এসেছিলাম তখন টুংটাং শন্দে মুগ্ধ হয়েছিলাম। কুটির শিল্প হিসেবে (যেহেতু হাতের কাজ) উদ্যোক্তারা আসলে ঋণদান, পরামর্শসহ তাদের জন্য কিছু করার সুযোগ ছিল। কিন্তু কেউই আমাদের কাছে আসে না। গবেষকের কথা: শরীয়তপুর জেলার ইতিহাস ঐতিহ্য নিয়ে গবেষনা করেন বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক অধ্যাপক এম এ আজিজ মিয়া। তিঁনি বলেন, কাশ পিতল শিল্পীরা নানান কারনে ধাপে ধাপে এদেশ ত্যাগ করেছে। শুধু জেলারই নয়, এই দেশের অন্যতম কাশ-পিতল শিল্পের উৎপাদন হতো এখানে। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কারনে পর্যায়ক্রমে তারা দেশ ছাড়ে। পিতলের স্থায়ীত্ব অনেক বেশি, সংরণে সুবিধা, পুরাতন হলেও এর দাম কমে না এবং পরিবেশ বান্ধব ও স্বাস্থ্যসম্মত। এসব দিক বিবেচনা করে আমাদের উচিত কাশ পিতলের সামগ্রী ব্যবহার করা।

আসাদুজ্জামান জুয়েল 
আইনজীবী ও সাংবাদিক

Tuesday, May 19, 2015

সাগরে ভাসছে মানবতা : কোথায় এখন মানবাধিকার?

সম্প্রতি সময়ে দেশে সবচেয়ে আলোচিত খবর অবৈধ ভাবে মানব পাচার। জীবিকার তাগিদে ছোট নৌকাযোগে উত্তাল সাগর পারি দিয়ে কর্মের সন্ধানে ছোটা মানুষগুলো পড়ছে বিপদে। অতপর গ্রেফতার, মৃত্যু, গণকবর! ভূখা নাঙ্গা হাড্ডিসার কিছু মানুষের প্রতিচ্ছবি বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই ঘটনা যখন চরম অবস্থায় পৌচেছে তখন সরকার সহ বিশ্ব বিবেকের গায়ে সামান্য সুরসুরি লাগছে। আসলে এমন কেন হচ্ছে?

আজ থেকে দশ-পনের বৎসর আগেও লোক মুখে শুনেছি, মিডিয়ার মাধ্যমে জেনেছি মানুষ ইটালী যাচ্ছে মাছের ফ্রিজিং গাড়িতে করে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌছাতে না পারলে মানুষ হিমায়িত অবস্থায় গিয়ে পৌছায়। হিমায়িত মাছের মূল্য আছে কিন্তু হিমায়িত মানুষের মূল্য নাই দুই পয়সাও! আবার দিনের পর দিন পায়ে হেটে, বন জঙ্গল পার হয়ে বরফের চাদরের উপর দিয়ে হেটে যায়, স্থানীয় ভাবে তাকে বলে ডাংকিমারি!! প্রকৃত শব্দটা কি হবে আমি নিজেও জানি না। ভুক্তভোগীদের জিজ্ঞেস করলে বলে ঐ এলাকায় বরফের খাল, নদী পায়ে হেটে পার হওয়াকে ডাংকিমারি বলে।

এই মানুষগুলো কি আর কোমড় সোজা করে দাড়াতে পারবে??
সেই সময়কার ডাংকিমারি করে যারা দেশে খালি হাতে শুধু জীবন নিয়ে ফিরে আসছে তাদের অনেকের সাথে আমার কথা হয়েছে পেশার কারনে। একসময় আমি সাংবাদিক ছিলাম। প্রথম আলো, কালেরকন্ঠ পত্রিকায় কাজ করেছি দীর্ঘদিন। পেশার কারনে মানুষের সাথে কথা বলেছি, মিশেছি, তাদের হৃদয় ভাঙ্গার গল্প শুনেছি। এই ঘটনায় আমার পরিচিত জন, আত্মীয় স্বজন, কন্ধু বান্ধবও ছিল। আমার এক বিয়াই এভাবে অবৈধ পথে ইটালী যাওয়ার চেষ্টা করে জীবন নিয়ে দেশে ফিরত এসেছে। দেশ থেকে পাকিস্তান হয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে প্রথমেই পড়ে মাফিয়াদের হাতে। সেখানে মাফিয়ারা আটকে রেখে মুক্তিপণ দাবী করে। মুক্তিপণ দিয়ে আবার পাড়ি দেয়। বরফের নদী পায়ে হয়ে যখন আলোর সন্ধান পাবে সেই মুহুর্তে গ্রেফতার। অতঃপর দেশে ফেরত।

আরেক পরিচিতজন এভাবেই দিন রাত বরফের উপর দিয়ে পায়ে হেটে এক স্টেশনে পৌছার পর দেখে পায়ে আর জোর নেই। পাটাই যেন বরফ হয়ে গেছে। আগুনে ছেকার জন্য পা রাখে আগুনের উপর। আস্তে আস্তে পা একটু গরম হয় ঠিকই কিন্তু আগুনের তীব্রতা অনুভব করতে পারে না। অনুভবের সেই বোধ শক্তি হারিয়ে গেছে। পরবর্তীতে দেখা গেল তার পায়ে পচন ধরেছে। যতটা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় পা গরম করা উচিত ছিল ততটা দ্রুত পা গরম করায় তার পায়ে পচন ধরে। পরবর্তীতে তাকে দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হলো। চিকিৎসা শেষে তার দুই পায়ের অর্ধেকটা করে কেটে ফেলতে হলো। জীবন জীবিকার টানে সুস্থ্য অবস্থায় বিদেশের পথে পাড়ি জমালেও পঙ্গু হয়ে গেল সে। এখন আর স্বাভাবিক অন্য দশজনের মত হাটতে পারে না, পছন্দ মত জুতা পড়তে পারে না। এভাবেই মানুষগুলো পণ্যের মত বিদেশ পাড়ি দিতে গিয়ে কেউ জীবন নিয়ে পালায় আবার কেউ জীবন দেয়। পিছনে ফেলে যায় অনেক স্মৃতি, পরিবার, ভালবাসার মানুষগুলো আর একরাশ স্বপ্ন।

জীবন্ত কঙ্কাল হেটে যাচ্ছে। এদের জন্য কি কারে মায়া হয় না??
আমাদের সকলের মনে একটাই প্রশ্ন, কেন মানুষগুলো এভাবে জীবনের ঝুকি নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে? বন জঙ্গল বরফের উপর দিয়ে জীবনকে সংকটে ফেলছে? এর অনেক কারন আছে যা বোধ্যারা ভাল বলতে পারবেন। তবে আমার কাছে যে কারনগুলো মনে হয় তা আমি আপনাদের সাথে একটু শেয়ার করে নিতে পারি।

অশিক্ষাঃ যারা জীবনের ঝুকি নিয়ে সমুদ্র, বন জঙ্গল বাড়ি দিচ্ছে তাদের বেশির ভাগ মানুষই অত্যন্ত অশিক্ষিত। অশিক্ষিত মানুষগুলো দেশে তেমন ভাল কোন কাজ করতে পারে না। তাদের ধারনা দেশে যেহেতু কিছু করতে পারলাম না তাই বিদেশ গিয়ে নিজের ভাগ্যটা পরিবর্তন করে ফেলবো দ্রুত সময়ে। বিদেশে গিয়ে যে কোন কাজই করবো কেউ দেখবে না। বিদেশের ঐ কাজই দেশে করলে একটু শরম লাগে!! তাই বিদেশে গিয়ে নিম্নমানের কাজই হোক আর উচ্চমানের কাজই হোক করে মোটা টাকা নিয়ে দেশে এসে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকিব!!

অগ্যতাঃ অশিক্ষিত এই মানুষগুলো জ্ঞান গরিমায়ও ছোট, কাজের অভিজ্ঞতাও কম, অনেকেই একদম অযোগ্য। বিদেশ বিভূইয়ে কি করতে পারবো, কি করতে হবে, কিভাবে যাওয়া যায়, কোন পথ বৈধ কিছুই জানা নেই। আর অগ্য-অনভিজ্ঞ এই মানুষগুলো বিদেশ পাড়ি দিয়ে বিপদে পরে নিজে, বিপদে ফেলে পরিবারকে, বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেশ ও জাতিকে।

কাজের অভাবঃ দেশে জনসংখ্যা অনুপাতে কাজের অভাব। এক্ষেত্রে সরকারের বিশাল গাফিলতি আছে নিঃসন্দেহে। সরকার উদ্যোগি হয়ে নাগরিকদের পর্যাপ্ত কাজের ক্ষেত্র, সুযোগ করে দিতে ব্যার্থ হওয়ায় মানুষগুলো পিপিলিকার মত দল বেধে বিপদের মুখে ঝাপ দিচ্ছে।

এভাবেই ক্যাম্পে ঠাই হয় মানবতার
উচ্চাভিলাশী মনঃ আমাদের দেশের সাধারণ মানুষগুলোর উচ্চাভিলাশী মন আজকের এই পরিস্থিতির জন্য অনেকটা দায়ী। দেশে কাজ করতে মন চায় না। দেশের কাজকে ছোট করে দেখে। একই কাজ ক্ষেত্রবিশেষ নিম্নমানের কাজ বিদেশে করতে মন্দ লাগে না। দেশে নিজের উদ্যোগে, নিজের মেধা খাটিয়ে, অল্প পূজি দিয়ে কাজ করতে উদ্যোগি হয় না এই মানুষগুলো। সবসময় চেয়ে থাকে উচু তলার মানুষের দিকে। তাকিয়ে তাকিয়ে মনের ভিতরে হিংসা পয়দা করে আর বলে আমারও এমন বাড়ি হতে হবে, আমারও এমন গাড়ি থাকতে হবে, আমিও দুহাত খুলে টাকা খরচ করবো!!! কিন্তু সবসময় যদি উপর দিকে না তাকিয়ে নিচের দিকে তাকাই তবে আজকের পরিস্থিতির মত উষ্ঠা খাওয়ার সম্ভাবনা থাকতো না। দ্রুত বড়লোক হওয়া যায় না। আস্তে আস্তে হলে সেটা মজবুত হয় এবং বেশিদিন টিকে থাকে। অন্যের অর্থবিত্তের দিকে না তাকিয়ে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী চলার মানসিকতা থাকলে কেউ বিপদে ঝাপ দিত না। তাই উচ্চাভিলাসী মনকে সংযত করতে হবে।
সরকারের ব্যর্থতাঃ সবচেয়ে বড় সমস্যা সরকারের উদাসীনতা ও ব্যর্থতা। সরকারের কাজ প্রতিটি নাগরিকের জীবন জীবিকার খেয়াল রাখা। প্রতিটি নাগরিককে যথাযথ ভাবে শিক্ষিত করে, কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলা। শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের পর যার যার যোগ্যতা অনুযায় কাজের ব্যবস্থা করা। আমাদের সরকার কি সেটা নিশ্চিত করতে পেরেছে? আমাদের সরকার কখনোই সেটা করতে পারেনি। পারলে আজকের এ দৃশ্য দেখতে হতো না। লাখ লাখ শিক্ষিত বেকার পড়ে আছে কাজের সুযোগ পাচ্ছে না। লাখ লাখ বেকার কর্মী পরে আছে কাজে লাগছে না। কাজের সুযোগ করে দিলে এভাবে কেউ বিপথগামী হতো না। সরকারের উদাসীনতা চরম পর্যায়ে পৌছে গেছে। ঘুষ, দুর্নিতি এমন রূপ ধারণ করেছে যার কারনে রাতের আধারে, দিনের আলোয় মানুষ ছোট্ট নৌকায় করে সাগর পাড়ি দিতে যাচ্ছে। দেশের অভ্যন্তর থেকে অবৈধ ভাবে মানুষ বাইরে যাবে আর বাইরে থেকে ভিতরে ঢুকবে এটা কি করে সম্ভব হয়? তাহলে দেশে নিরাপত্তার জন্য হাজার কোটি টাকা খরচ করে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন পোষা হয়? দেশের ভিতর প্রতারক চক্র ঘুরে ঘুরে মুরগি কেনার মত করে বোকা-অগ্য মানুষগুলোকে কিভাবে বিদেশে পাচার করে? দালালরা কিভাবে পার পেয়ে যায়। দালালদের টাকার ভাগ কি প্রশাসনের লোকজন পায় না? না পেলে কেনই বা তাদের বাধা দেয় না? সাধারণ মানুষ তার শেষ সম্বল ভিটে মাটি বিক্রি করে, স্থানীয় এনজিওর কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে। প্রতারিত হয়ে কি শুধু অর্থ বিত্তই হারায়, হারায় তার স্বপ্নও। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চোখে শরষে ফুল দেখে গৃহকত্রী। পিতা-ভাই হারিয়ে নিঃশ্ব হয় সন্তান-স্বজন। সামান্য রোজগারের জন্য বিদেশে পারি দিয়ে কত মায়ের বুক খালি হলো, কত স্ত্রী স্বামী হারা হলো, কত সন্তান পিতা হারা হলো, গভীর সমুদ্রে মাছের খাবারে পরিনত হল আপনজন।

অবৈধ অভিবাসী হিসাবে সাগর পারি দিতে গিয়ে লাশ হয়
ঝুকিপূর্ণ বিদেশ পাড়ি দেয়ার ক্ষেত্রে শুধুকি পুরুষই নারী-শিশুরাও সামিল হয়েছে। নারীরা হয়ে যাচ্ছে ভোগের পন্য। নির্যাতন স্বীকার করে উজ্জল ভবিষ্যতের আশায় ছুটে যাচ্ছে সমুদ্র পাড়ি দিতে। ভবিষ্যতের উজ্জলতা ম্লান হয়ে যাচ্ছে মুহুর্তেই। দালালের ক্ষপ্পরে পরে জিম্মি হয়ে দেশে কিছু থাকলে তা বিক্রি করে টাকা তুলে দিচ্ছে মাফিয়ার হাতে। সেই টাকাও যাচ্ছে অবৈধ পথে। দীর্ঘদিন যাবৎ এমনটা হচ্ছে সরকার কি কিছুই জানে না? আর কত না জানার ভান করে থাকবে সরকার। আর কত??

দেশে একজন মানুষ ক্রসফায়ার হলে বা অবহেলায় মৃত্যু হলে বা অপঘাতে মৃত্যু হলে আমরা জেগে উঠি। জেগে ওঠাই স্বাভাবিক। আমাদের সাথে বিশ্ব বিবেকও জেগে ওঠে। আজ হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে, গণকবর আবিস্কার হচ্ছে, সমুদ্রে অনাহারে থাকা মানুষগুলোকে তীরে ভিরতে দিচ্ছে না।

এভাবেই সবাই পায়ে ঠেলে দেয় মানবতা।
কেন এখন বিশ্ব বিবেক জেগে উঠছে না। কেন কঠর ভাবে নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা হচ্ছে না? সাগরে ভাসমান মানুষগুলো হোক বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের। তারাওতো মানুষ। বিশ্ব বিবেক কেন প্রচন্ন চাপ সৃষ্টি করছে না আজ। এক পৃষ্ঠা প্রেস রিলিজ বা একটু চোখ রাঙ্গানি দিয়েই কি তাদের দায়িত্ব শেষ? হাড্ডিসার কঙ্কালের মত মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকালে বড় মায়া হয়। এই মানুষগুলো যেখানে যেতে চাইছিল সেখানে গিয়েও কোন কাজ করতে পারবে বলে আমার মনে হয়না। আর এ মানুষগুলো দেশে এসেও কোন কাজ করতে পারবে কিনা আমি জানি না।

অসহায় মানুষগুলো দেখে বড় মায়া হয়। নিজের বিবেকের কাছে কেন যেন প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, কোথায় আজ মানবতা? মানুষ হিসাবে আমাদের কি এ ঘটনা চেয়ে চেয়ে দেখতেই হবে? কিছুই কি করার নেই? ঠুটো জগন্নাথরা কি বিবৃতি দিয়ে পেয়ালায় পেয়ালায় চিয়ার্স করবে? দালালরা কি বহাল তবিয়তেই তাদের কাজ চালিয়ে যাবে আর আমাদের রাষ্ট্রীয় জানোয়াররা কি দালালদের টাকায় শরীরের মেদ বারাবে?

আসাদুজ্জামান জুয়েল
আইনজীবী
১৯ মে ২০১৫

Sunday, May 10, 2015

মা...


মায়ের ভাষা শুনেও আমি বুঝিনি মায়ের কথা
মা হারিয়ে বুঝি এখন মা হারানোর ব্যাথা।

মায়ের অভাব হয়নি পূরন পেয়েছি আমি যতই
মায়ের অভাব হয় না পূরন পেলাম ভবে কতই!

মা থাকতে মা’যে আমার চাইলো নাতো কিছু
দিতে না পারার কষ্ট যে আজ ছারছে না মোর পিছু।

শত কষ্ট, অভাব-অনটন বুঝতে দেয়নি মা!
না শোনা কথার জন্য মাফ চাইতাম ধরে পা!

ইচ্ছা হলেও আজকে আমার চাওয়ার জায়গা নাই
শত ব্যস্ততা কাজের মাঝেও মায়ের পরশ পাই

আমার মায়ের হাসি মাখা মুখ পৃথিবীর চেয়েও সেরা
বুঝতে পারি যখন তখন আমি যে এক মা হারা।

মাগো তোমায় ভুলবো আমি সেই সাধ্য কি আছে
চেষ্টা করি মাকে যেন ভুলে না যাই পাছে.....
10.05.2015

Saturday, March 28, 2015

শোক সংবাদ
মাহমুদপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদারের ইন্তিকাল : আজ দাফন

শরীয়তপুর জেলার সদর উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আমেরিকা প্রবাসী মোঃ সেলিম আহমেদ ও মেজবাউর রহমান উজ্জলের পিতা মোতাহার হোসেন তালুকদার গত বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকালে আমেরিকায় ইন্তিকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি... রাজিউন)। মৃত্যুকালে দুই পুত্র, এক কন্যা, স্ত্রীসহ বগু গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। আজ সোমবার বাদ আছর মরহুমের মাহমুদপুর গ্রামের নিজ বাড়িতে জানাজা শেষে দাফন করা হবে। সকল ধর্মপ্রাণ স্বজন-শুভাকাংখিদের জানাজায় অংশ নেয়ার জন্য বিনীত ভাবে আহবান জানানো হলো।

Monday, March 23, 2015

আমার মায়ের ডাক ও মুখ

মা... মা... মা...। পৃথিবীতে যত কিছু আছে মায়ের সাথে কোনটারই তুলনা করা যায় না। পৃথিবীতে যত কথা, যত শব্দ আছে মা শব্দের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোন শব্দ খুজে পাইনি। এত মধুর, এত সুরেলা, এত মমতা মাখা, এত আবেগী একটা শব্দ যে মা ডাকাতেই তার স্বাদ পাওয়া যায়। অন্য কোন ডাকে বা অন্য কোন শব্দ উচ্চারনে এত প্রশান্তি লাভ করা সম্ভব নয়। 
রওশননারা বেগম ১৯৪৭-২০১২
আমার মা নেই। বিগত ৩০ মার্চ ২০১২ তারিখে আমার মা আমাদের চির বিদায় দিয়ে পৃথিবী থেকে চলে গেছে। কোন শান্তনাই মায়ের অভাব পুরন করতে পারেনি। কোন ডাকেই মায়ের মমতা মাখা আবেগ পূর্ন করতে পারেনি। কোন কিছুতেই মন শান্ত হয় না, আজও শান্ত হয়নি, আর হবেও না জানি। কারন মা তো আর ফিরে আসবে না। মায়ের কাছে শত আব্দার করেছি ফেরায়নি কোন আব্দারই। কত অভিমান করেছি মা মনে রাখেনি। শত রাগের পরেও খাবার সময় ঠিকই রাগ ভেঙ্গে ডাক দিয়েছে। বাড়িতে ফিরতে দেরি হলে খোঁজ নিয়েছে। মুখ ভারি দেখলে শান্তনা দিয়েছে। ভিতরে হিংসা দেখলে উপদেশ দিয়েছে। এমন উদার গর্ভধারিনী জননী ছাড়া আর কে হতে পারে? এমন নির্লোভ ভালবাসা মা ছাড়া আর কে দিতে পারে? সবই উপলব্ধি করতে পারছি এখন যখন মা আর কাছে নেই। মায়ের জন্য কিছুই করতে পারিনি-অপরাধবোধ কাজ করে প্রতিনিয়ত। কিন্তু মার কোন দিন কোন চাওয়া ছিল না আমার কাছে। কোন দিন কিছু চায়ওনি। আর মায়েরা কোনদিন কিছু চায়ও না, শুধুই দেয়। দিতে দিতে নিঃশেষ হয়ে যায় তবুও দেয়া ফুরায় না। মাকে আর কিই বা দিব, কিই বা দেয়ার আছে আমাদের। মায়ের মুখের মধুর ডাক এখনও কানে বাজে। আমার মা আমাকে বাবা বলেই ডাকতো। কি মধুর সে ডাক। এখন আর ডাকে না কিন্তু প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনি বাজে কানে। এখনও সমাধির পাস দিয়ে যাওয়ার-আসার সময়, নিরবে নিভৃতে থাকার সময়, একলা পথ চলার সময় শুনি সেই মধুর বাবা ডাক। আমার মা আমাকে এতটাই বাবা ডেকেছে যে মায়ের মৃত্যুতে আমার কাছে মনে হয়েছে আমি মা হারাইনি আমার আদরের সন্তান হারিয়েছি। মা হারিয়ে প্রথমে ডুকরে ডুকরে কেদেছি দেখে অনেকেই শান্তনা দিয়েছে। আস্তে আস্তে ডুকরে কাদা থেমে গেছে। এখনও কাদি। তবে নিরবে নিভৃতে। বুকের ভিতর মা হারানোর ব্যাথা যে কত কষ্টের তা পরিমাপের কোন যন্ত্র নেই, প্রকাশের কোন ভাষা নেই। এখন আর চোখ বেয়ে অশ্রু ঝড়ে না। মুখ ফ্যাকাশে হয় না। কিন্তু বুকের ভিতর চিন চিন ব্যাথা হয়, কথা জড়িয়ে যায়, অনুভব করি তখন গর্ভধারিনী মা আর নেই, আর আসবে না। সব ব্যাথা ভুলে যাওয়া যায় না। আঘাতের ব্যাথা সেরে যায়, বন্ধুদের দেয়া কষ্ট মুছে যায়, মা হারানোর ব্যাথা শত চেষ্টায়ও ভুলে থাকা যায় না। ভুলবই বা কি করে? মায়ের যে অবদান, মায়ের যে আত্ম ত্যাগ, মায়ের যে ভালবাসা, মায়ের যে উদারতা, মায়ের যে মমতা তার সাথে তো কোন কিছুরই তুলনা করা যায় না! তাই মা হারানোর ব্যাথা কখনো যায় না, যাবেও না। এখন দুঃখ পেলে মায়ের দেয়া শান্তনাগুলো কানে বাজে, এখনো কষ্ট পেলে মায়ের কথাগুলো মনে পরে, এখনও মনে হিংসা-ক্রোধ দানা বাধলে মায়ের উপদেশগুলো কানে বাজে, শান্ত হয়ে যাই, উদার হতে চেষ্টা করি। একজন মা এতটা উদার, মমতাময়ী কি করে হয় ভেবে পাই না। তাই মনে মনে ভাবি, মা ছিল, মা থাকবে। লোকচক্ষুর আড়ালে গেলেও মায়ের অস্তিত্ব টের পাই, দেখানো পথে হাটতে চেষ্টা করি। চিরদিন যেন মায়ের দেখানো পথে হাটতে পারি আল্লাহর কাছে সেটাই চাই। মায়ের দোয়াতেইতো আজকের আমি, আমার অবস্থান, আমার সবকিছু।  
দেখতে দেখতে অনেকটা বছর কেটে গেল। আমিও বাবা হলাম আবার। গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ আমি বাবা হয়েছি। আল্লাহর কাছে আমি একটা মা’ই চেয়েছিলাম। মহান আল্লাহ আমার মনের কথা শুনেছেন। আমাকে একটা কন্যা সন্তান দিয়েছে সৃষ্টিকর্তা। আমার মায়ের বিদায়ে আমি কেদেছি। আবারও কাদলাম আমার নতুন মায়ের কান্নার শব্দে, নতুন মাকে কোলে নিয়ে। আমার কন্যার নামও রেখেছি মায়ের নামের সাথে মিল রেখে। আমার মায়ের নাম ছিল রওশনারা বেগম। আমার কন্যার নাম রওশন আসাদ প্রিয়ন্তী। প্রিয়ন্তী একটু একটু করে বড় হচ্ছে। সে আস্তে আস্তে বিভিন্ন শব্দ করতে শিখছে। বুঝে কোন শব্দ করে না জানি। কিন্তু প্রিয়ন্তীর মুখে প্রথমেই সেই মায়ের ডাক। আমার মা আমাকে সবসময় বাবা বলেই ডাকতো। প্রিয়ন্তী মুখ দিয়ে আব্বু আব্বু শব্দ উচ্চারন করে! সকল শিশুই শুরুতে দাদা, দাদি, বু শব্দ উচ্চারন করে। আমার কন্যা স্পষ্টই আব্বু শব্দ উচ্চারন করে! আমি অভিভূত হই, অবাক হই না। আল্লাহ আমার মাকে নিয়ে আবার আমাকে মা দিয়েছে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের অভাব বোঝেন। তাই আমার কন্যা আমাকেই ডাকছে। কন্যার মুখে আব্বু শব্দ শুনে আমি মহান স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। আমার মায়ের গায়ের রং ছিল কালো কিন্তু অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা নিয়ে জন্মেছিল। তার জ্ঞান গরিমায় তাকে মরহুম ফজলুর রহমান কোতোয়ালের মেয়ে না বলে অনেকে ছেলে বলতো!! আমার মায়ের গায়ের রং আমি পেয়েছি। আমার কন্যার গায়ের রং তার মায়ের মত। কিন্তু প্রিয়ন্তী মুখের গড়ন পেয়েছে আমার মায়ের মত। আমার মায়ের মুখ গোলাকার, সর্বদা হাসি মাখা। রাগলেও কখনো ধরা দিত না। শত কষ্ট, অভাব-অনটন আমার মায়ের মুখে ছাপ ফেলতে পারেনি। গোলাকার হাসিমাখা মায়ের সে মুখ আমি ভুলতে পারি না। সর্বদা আমার চোখের সামনে ভাষে। আমার মেয়ের গোলাকার হাসিমাখা মুখ দেখে আমি মায়ের মুখের সাথে মিলিয়ে ফেলি। প্রিয়ন্তীর মুখের দিকে তাকালে আমি আমার মায়ের কথা মনে করি। তাই প্রিয়ন্তীকে আমার নাম ধরে ডাকা হয়না। আমি মা বলেই ডাকি। আমি বাড়ি ফিরলে যেমন আমার মায়ের মুখ উজ্জল হয়ে যেত। কন্যার মুখেও তেমনি আমি বাড়ি ফিরলে হাসি ঝড়ে পরে। আমার বাড়ি ফেরার পর সে ঘুমে থাকলেও জেগে ওঠে। 
আমার মায়ের অনেক আচরণই আমি আমার কন্যার মধ্যে খুঁজে ফিরি। কিছু কিছু মিলে যায়। আমি দেখে আনন্দ পাই। আমি সবসময় বলি, আমার কন্যা যেন আমার মায়ের মত বুদ্ধি পায়, মেধা মননে যেন মায়ের মত হয়। সে যেন আমার মায়ের মত উদার, মমতাময়ী হয়। সে যেন সকলের প্রশংসা কুড়ায়। আমি আমার কন্যার ভিতর আমার মায়ের মুখ ও ডাক ফিরে পেয়েছি। সেই ডাক ও মুখ ফিরে পাই, কখনো বেশি পাই। কিন্তু মাকে ভুলতে পারি না, পারবোও না। ভাল থাকুক আমার নতুন মা, শান্তিতে থাকুক আমার মা.............

আসাদুজ্জামান জুয়েল
এডভোকেট 
জেলা জজ আদালত, শরীয়তপুর। 
asadjewel@gmail.com

Monday, December 29, 2014

শিশু জিহাদ ও আমাদের রাজনীতিতে অবিশ্বাসের বিষ

শরীয়তপুরের সন্তান জিহাদ। কেউ তাকে চিনতো না কয়েকদিন আগেও। নিয়তির নির্মম বাস্তবতায় জিহাদ আজ আমাদের মাঝেই নয় সারা বিশ্বে পরিচিত নাম। কিন্তু জিহাদ মরিয়া প্রমান করিল সে পাইপেই ছিল!!! জিহাদ মরিয়াই প্রমান করিল ঘটনা গুজব নয় বাস্তব। জিহাদ মরিয়াই প্রমান করিল আমাদের রাজনীতিতে অবিশ্বাসের বিষ এতটাই বেশি যে বাস অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। জিহাদ মরিয়াই প্রমান করিল আমাদের দেশে উৎসুক জনতা-মিডিয়া-প্রশাসন কেউই নিজের কাজ সম্পর্কে দায়িত্বশীল নয়। আমরা সবাই অতি উৎসাহী।
রাতে বাসায় ফিরে টিভি ছাড়ার সাথে সাথে যে খবরটি চোখ আটকে দিলো তা হলো জিহাদ নামে একটি শিশু খোলা গভীর নলকুপের পরিত্যক্ত পাইপের মুখ দিয়ে পড়ে গেছে। পাইপের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নিয়ে শুরু হলো গবেষণা! সেই সাথে তাকে উদ্ধারের চেষ্টা। ফায়ার ব্রিগেডের লোকজন বলছে আমরা জিহাদের সাথে কথা বলেছি, সে জুস খেয়েছে। ইত্যাদি...।
এই কথাগুলো টিভিতে দেখলাম রাতে। জিহাদ পাইপে পড়েছে সেই বিকালে! সর্বশেষ ডাক্তারদের ফরেনসিক রিপোর্টে জানাগেল জিহাদ পাইপে পরার ২ ঘন্টার মধ্যে মারা গেছে এবং মাথা আঘাত পাওয়ার পর সে পানিতে ডুবে যায়, ডাক্তারদের কথায়-পানিতে না ডুবলেও জিহাদ মাথায় আঘাতের কারনে মারা যেত। তাহলে প্রশ্ন আসে জিহাদ যদি পাইপে পতনের ২ ঘন্টার মধ্যেই মারা যায় তবে জুস খেল কে? যাহোক, আমাদের দায়িত্বশীল লোকদের আসলেই কোন দায়িত্বজ্ঞান নেই এটা বার বার প্রমান করে।
উদ্ধার তৎপরতার এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সহ অন্যান্যরা ঘোষণা দিলেন এখানে কোন শিশুর অস্তিত্ব নাই! উদ্ধার অভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণার কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বেচ্ছাসেবীরা নিজেদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে উদ্ধার করে ফেলে জিহাদকে। এখন কিভাবে পাওয়া গেলো জিহাদকে?? এই প্রশ্নগুলো কে করবে?? কিভাবে করা যায়?? উত্তর দেয়ার দায়িত্বই বা কার??
জিহাদকে উদ্ধার করার পর সেখান থেকে তাকে বাইরে আনার জন্য যেভাবে কষ্ট করতে হয়েছে সেটা চোখে পরার মত। কেন জিহাদকে পাওয়ার পর জিহাদকে নিয়ে এম্বুলেন্স এর দরজা পর্যন্ত যাওয়ার রাস্তা ফাকা হয়ে গেল না? মিডিয়া কর্মীরা ছবি তুলছে পেশাগত কারনে, কিন্তু উৎসুক জনতা ভির করে মোবাইলে ফটো তুলছে আর ভির বারাচ্ছে, কেন এটা হচ্ছে? পুলিশ কেন অযাচিত-অনাকাঙ্খিত লোকজন ঠেলে সরিয়ে দেয় না?
আমাদের মিডিয়া যেভাবে বিষয়টা তুলে ধরেছে সে জন্য ধন্যবাদ তবে সেই সাথে এটাওকি ভেবে দেখা উচিত নয় যে, বারাবারি হয়ে যাচ্ছে কিনা? মিডিয়া কর্মীদের কারনে উদ্ধার কাজের কোন ব্যাঘাত ঘটছে কিনা? মিডিয়া কর্মীরা যখন বক্তব্য সংগ্রহ করেন তখন ঐ বক্তব্যদানকারীর কাজের সমস্য হচ্ছে কিনা সেগুলো বিচার করার সময় এখন হয়েছে।
জিহাদ পাইপে পরেছে বিকালে। পরদিন তার লাশ পাওয়া গেল। আমি সন্ধায় আমার বন্ধু শাহীন মিয়ার দোকানে বসে নেটে ঘাটাঘাটি করছি আর দেখছি কে কোন ভিডিও ক্লিপ দিয়েছে? কিছু ডাউনলোড করে দেখলাম। মনে চাপা কষ্ট চেপেই রাখলাম। এক ভদ্রলোক এসে মন্তব্য করছেন, এগুলো ভুয়া খবর। জনগনের চোখ গাজীপুর থেকে সরাইতে সরকার নাটক সাজাইছে! আমি তাকে বললাম, ভাই নাটক না, ছেলেটার লাশ পাওয়া গেছে। ভদ্রলোক আমার কথাও বিশ্বাস করলো না। লাশ পাওয়া গেছে সেটা শোনার পরও সে বলে যাচ্ছে, এগুলো ভুয়া, মিথ্যা নাটক। আমার বন্ধু শাহীন তার ক্ষোভ চাপতে না পেরে ভদ্রলোককে বললো, মিয়া আপনার মতো কিছু কট্টর বিএনপি-কট্টর আওয়ামীলীগ দেশে আছে বলেই আমাদের এই দুর্দশা!! লাশ পাইছে তার পরেও আপনি বলেন নাটক!
অবিশ্বাসের বিষ আমাদের বাতাশে এতটাই বেড়ে গেছে যে লাশ পাওয়ার পরও বিশ্বাস করছে না যে ঘটনা সত্যি!!! বিএনপি পন্থিরা বিএনপির চিন্তাধারা মতে কথা বলছে! কোন এক নেতা হয়তো বলছে এটা নাটক, তাই সবাই বলছে নাটক। পরে জিহাদের লাশ প্রমান করলো জিহাদ নাটক জানেনা!! সরকার হালকা ঘেটেঘুটে কিছু না দেখে বলে দিল কোন লাশের অস্তিত্ব নাই। পরে জিহাদ প্রমান করে দিল অস্তিত্ব আছে তার প্রমান লাশ!!

Saturday, November 22, 2014

মামলার কোর্ট ফি (Advalorem Fees) নির্ধারণ পদ্ধতি

মামলা মোকদ্দমা পরিচালনার জন্য আদালতকে একটা নির্দিষ্ট পরিমানে কোর্ট ফি দিতে হয়। এই ফি আইনজীবী ফি এর বাইরে মামলা দায়েরের খরচ। মামলা দায়েরের খরচ নির্ধারণ করা হয় Court Fees Act, 1870 সংশোধনী ২০১০ (২০১০ সনের ৪৫ নং আইন-১ আগষ্ট ২০১) এবং ২১ সেপ্টেম্বর ২০১০ এর এস,আর,ও নং-৩২৬-আইন/২০১০ অনুযায়। 
কোর্ট ফি নির্ধারণ পদ্ধতি:
কোন মোকদ্দমার মূল্যমান এর উপর বা দাবীর মূল্যমানের উপর কোর্ট ফি নির্ণয় করা হয়ে থাকে। 
তায়দাদের উপর ২%
উক্ত ২% এর উপর ১৫% ভ্যাট। মোট (২%+২% এর ১৫%= কোর্ট ফি)
 
মানি স্যুট বা অর্থঋণ মোকদ্দমা :
মানি স্যুট বা অর্থঋণ মোকদ্দমার ক্ষেতে সর্ব নিম্ন কোর্ট ফি হলো ৩০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ কোর্ট ফি হবে ৫০,০০০ টাকা। 
দেওয়ানী মোকদ্দমা:
দেওয়ানী মোকদ্দমার সর্বো নিম্ন কোর্ট ফি হবে ৩০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ কোর্ট ফি হবে ৪০,০০০ টাকা।
সাকসেশন মোকদ্দমা:
সাকসেশন মোকদ্দমায় ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত ফ্রি। পরবর্তী ১,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ১% এবং পরবর্তী ১৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ২%। 

যেমন: 
কোন মোকদ্দমার তায়দাদ ধরি ১৫,০০,০০০ টাকা।  এর কোর্ট ফি হবে
১৫,০০,০০০ টাকার ২%=৩০,০০০ টাকা
৩০,০০০ টাকার ১৫%= ৪,৫০০ টাকা
মোট কোর্ট ফি লাগবে ৩০,০০০+৪,৫০০=৩৪,৫০০ টাকা। 
 

Tuesday, November 4, 2014

আগাম জামিন (Anticipatory bail)

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা সংরক্ষণের অধিকার প্রদান করেছে, উক্ত অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনে বর্নিত বিধান ব্যতীত জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার থেকে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না। আইনের আরেকটি সাধারণ নীতি হল- “Everyone shall be presumed to be innocent unless he is found guilty by a competent court”. আইনের চোখে অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষী নয়, আসামী মাত্র।সুতরাং বিশেষ কোন হেতু ভিন্ন কোন ব্যক্তিকে আটকের পর আদালত আইন ও তার সু-বিবেচনা মূলক এখতিয়ার প্রয়োগের মাধ্যমে আটককৃত ব্যক্তিকে আদালতের আদেশমত নিদৃষ্ট স্থানে এবং নিদৃষ্ট সময়ে আদালতে হাজির হওয়ার শর্তে সাময়িক মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারেন যাকে আইনের চোখে জামিন বলা হয়।ফৌজদারী কার্যবিধিতে জামিন প্রসঙ্গে ২ ধরনের অপরাধের কথা সু-স্পষ্ট ভাবে বর্ণিত হয়েছে—১) জামিনযোগ্য অপরাধ(৪৯৬ ধারা); এবং ২) জামিন অ-যোগ্য অপরাধ।(৪৯৭ ধারা)।এছাড়া, গ্রেফতার পূর্ব জামিন বা anticipatory bail নামীয় আরেক ধরনের জামিনের চর্চা হাইকোর্ট সহ দায়রা আদালতে হতে দেখা যায়।(ধারা-৪৯৮)

বাংলাদেশে প্রচলিত ফৌজদারী কার্যবিধি,১৮৯৮-এ আগাম জামিন সম্পর্কে সু-স্পষ্ট বিধান নেই। কিন্তু ৪৯৮ ধারায় উল্লেখিত “হাইকোর্ট বিভাগ ও দায়রা আদালত যে কোন ক্ষেত্রে যে কোন ব্যক্তিকে জামিন মঞ্জুর ---- নির্দেশ দিতে পারেন।“- শব্দগুলোর সম্প্রসারিত অর্থ দ্বারা আসামীকে ক্ষেত্রে বিশেষ জামিন প্রদান করে থাকেন। মূলতঃ আমদের দেশের আগাম জামিন সম্পর্কিত ৪৯৮ ধারার শিরোনামের দিকে তাকালে দেখা যাবে, “৪৯৮। জামিন মঞ্জুর ও জামিনের অর্থের পরিমাণ হ্রাসের ক্ষমতা”-‘র কথা বলা হয়েছে।অর্থাৎ ওই ধারাতে আগাম জামিনের বিধানের চেয়ে ’জামিনের অর্থের পরিমাণ হ্রাসের ক্ষমতা’-কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভারত সহ বিশ্বের অন্যান্য দেশ এদিক থেকে অনেক এগিয়ে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ভারতীয় ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৩৮/৪৩৯ ধারায় আগাম জামিন সম্প্রর্কে সু-স্পষ্ট ও কমপ্রিহেন্সিভ বিধান রয়েছে।

আগাম জামিন

ফৌজদারী কার্যবিধির অধীনে দুই ধরনের জামিনের চর্চা আছে, সাধারণ জামিন(Regular Bail) যা আসামীর আটকের পর আদালত কর্তৃক মঞ্জুর হয়; আর আরেক ধরনের জামিন হল আগাম জামিন (Anticipatory Bail) যা আসামীর গ্রেফতারের পূর্বে আদলত মঞ্জুর করে থাকেন। আগাম জামিনের আভিধানিক অর্থ গ্রেফতারের পূর্বেই প্রাপ্ত জামিন। আর্থাৎ গ্রেফতারের পূর্বে উদ্ভূত বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় কোন ব্যাক্তির আবেদনের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট মামলায় আদালত আটককৃত ব্যক্তিকে যে জামিন মঞ্জুর করে থাকেন তাকেই আগাম জামিন বলা হয়।

আগাম জামিনের প্রয়োজনীয়তা

পূর্বে শত্রু পক্ষের কাউকে দমিয়ে রাখার জন্য যাদু-টোনা করা হত বলে শুনেছি; বর্তমানে যাদু-টোনার সেই স্থান দখল করে আছে মিথ্যা মামলা। যদি কোন ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে অপরাধী না হন তাহলে বিচারের পূর্বে গ্রেফতার ও কারাগারে দূর্বিসহ বন্দী জীবন কাটাতে বাধ্য করা ভিন্ন অর্থে অপরাধ প্রমানের আগেই শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করার নামান্তর। এবং এক্ষেত্রে আদালতই এ সকল নিরীহ মানুষগুলোর শেষ ভরসাস্থল। সুতরাং যে ক্ষেত্রে আসামী আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, যে ক্ষেত্রে আসামীর এরুপ অপরাধে জড়িত হবার কোন স্বাক্ষর নেই বা আসামীর জামিনে মুক্তির পর পলায়নের কোন সম্ভাবনা নেই বা তাঁকে আইন শৃখলা বাহিনীর হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপক কোন কারন নেই, সে ক্ষেত্রে আসামীকে গ্রেফতারের পূর্বেই জামিনে মুক্তি দিতে আদালত কার্পন্য করবেন না।

আগাম জামিনের আইনি বিধানের পরীক্ষা

মূলতঃ ‘আগাম জামিন’ প্রত্যয়টিকে কিছু ক্ষেত্রে সমালোচকগন Misnomer বা ভূল ভাবে সংজ্ঞায়িত একটি প্রত্যয় হিসাবে অনেকে ব্যখ্যা করেন। কারণ,তাদের প্রশ্ন হল জামিনের অধিকারের সূত্রপাত কখন ঘটবে? – আসামী যখন আইন শংখলা বাহিনীর আইনগত হেফাজতে(Lawful Custody) থাকবে তখন থেকে। সেই হিসাবে কোন ব্যক্তি গ্রেফতারের পূর্বেই যখন জামিনের আবেদন করেন তখন তাকে Misnomer না বলে পারা যায় না। তবে, আমার হিসাবে যখন কোন ব্যক্তি আদালতের শরণাপন্ন হচ্ছেন তখন তিনি মূলত আদালতের কাছে নিজেকে সমর্পণ করছেন এবং পরিস্থিতি বিবেচনায় নিজের মুক্তির জন্য আদালতের কাছে আর্জি জানাচ্ছেন যার কারণে গ্রেফতারের পূর্ব থেকেই জামিন অনুমোদনের হিসাবে তথাকথিত অর্থে Misnomer বলা অনেকাংশে সমীচীন নয়।

যাই হোক,ভারতীয় সংবিধান সর্বপ্রথম যখন বলবৎ হয়েছিল ফৌজদারী কার্যবিধিতে তখন আমাদের দেশের মত আগাম জামিনের কোন সুস্পষ্ট বিধান ছিল না। সুতরাং আইনের অনুপস্থিতিতে, গ্রেফতারের পূর্বে কোন ব্যক্তিকে জামিন দেওয়া উচিৎ কিনা এ প্রশ্নে Varkey Paily Madthikudiyil (1967)- মামলায় কেরালা হাইকোর্ট মন্তব্য করেছিলেন,” যতক্ষন না কোন ব্যক্তিকে আটক আর্থাৎ লিগ্যাল কাস্টডিতে রাখা না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জামিন মঞ্জুর করা যায় না।

Kartar Singh v. State of Panjab ,মামলায় পাঁচজন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চে উত্তর প্রদেশের একটি আইনের বৈধতা যাচাই করা হয় এই মর্মে যে, আইনটিতে আগাম জামিনের প্রয়োগযোগ্যতার বিষয়ে কোন বিধান ছিল না। Constitutional Bench- উল্লেখ করেন যে, আগাম জামিনের বিধান বাতিল করা হয়েছে শুধু এই কারণে বলা যাবে না যে, উক্ত বাতিলের মাধ্যমে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের চর্চাকে বাধাগ্রস্থ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতে সংবিধানের সাথে সংগতি বজায় রেখে রাজ্য সমূহ কেন্দ্রীয় কার্যবিধিকে ভিত্তি ধরে তাদের নিজস্ব কার্যবিধি সংক্রান্ত আইন গ্রহণ করতে পারে।

আগাম জামিন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে আদালতের বিবেচ্য বিষয়াবলী

সাধারণভাবে, জামিন অযোগ্য মামলায় জামিন আবেদনের শুনানী প্রসঙ্গে আদালত যে সকল বিষয় বিবেচনা করবেন আগাম জামিনের ক্ষেত্রে ও আদালত একই বিষয় সমূহ বিবেচনা করবেন। [19 DLR 39 (SC)] যাই হোক,আগাম জামিনের বিষয় সাধারণ জামিনের বিষয় থেকে একটু হলেও ভিন্ন এবং আগাম জামিনের আবেদন বিবেচনাকালে আদালত মোটাদাগে নিন্ম লিখিত বিষয় সমূহ বিবেচনা করতে পারেনঃ

১। উত্থাপিত আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং তর্কিত অভিযোগের নিবিড় বিবেচনায় আদালতের কাছে যদি এটি প্রতীয়মান হয় যে, আসামীকে উক্ত মামলায় কোন খারাপ উদ্দেশ্যে জড়ানো হয়েছে এবং ওই মামলায় গ্রেফতারের মাধ্যমে তাকে সামাজিক ভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে অথবা আসামীকে উক্ত মামলার মাধ্যমে ক্ষতির মুখোমুখি করাই একমাত্র উদ্দেশ্য তাহলে আদালত তাঁকে গ্রেফতারের পূর্বেই নিজ বিবেচনায় জামিন মঞ্জুর করতে পারেন।

২। আদালত আগাম জামিনের ক্ষেত্রে একটা অ-স্পষ্ট ও অ-নিদৃষ্ট(Blanket Order) মঞ্জুর নামা জারি করবেন না। আদালত এক্ষেত্রে সুনিদৃষ্ট অপরাধ ও অভিযোগ ও তৎপ্রসঙ্গে আবেদননামা বিবেচনা করতঃ শ্বুধুমাত্র তার ভিত্তিতেই জামিন মঞ্জুর করবেন। [ G. V. Prabhu v. State, (1975) CrlJ 1339-40 (goa)]

৩। আগাম জামিন মঞ্জুরের পূর্বে আদালত এটিই বিবেচনায় রাখবেন যে, উক্ত মামলায় জিজ্ঞাসাবাদ বা তথ্য উধঘাটনের জন্য আসামিকে পুলীশ হেফাজতে নেবার প্রয়োজন রয়েছে কিনা? যদি এরুপ প্রয়োজন বিবেচিত হয় তাহলে আদালত জামিন না-মঞ্জুর করতে পারেন।

৪। আদালতের আগাম জামিনের ক্ষমতাকে বলা হয় ‘Power of Extra Ordinary Nature)। সুতরাং, এটি বিশেষ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ব্যবহার করা উচিৎ। যদি আদালত এটি উপলব্ধি করেন যে, আসামী তার জামিনের সুযোগের অপব্যবহার করবেন না বা মামলা প্রভাবিত করবেন না সে ক্ষেত্রে আদালত আগাম জামিন মঞ্জুর করতে পারেন।

৫। আগাম জামিন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে আসামীকে আদালতে সশরীরে উপস্থিত হতে হবে। আগাম জামিনের আবেদন সাধারণত তাদের ক্ষেত্রে না-মঞ্জুর করা হয় যারা তদন্তকারী সংস্থাকে সহায়তা করেন না বা করার সম্ভাবনাও ক্ষীন, অথবা যাদেরকে ‘Custodial Interrogation’ প্রয়োজন অথবা যারা জামিনে মুক্ত থেকে মামলা প্রভাবিত করতে পারেন।

৬। কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের আমল গ্রহণ করার পর এমন কি চার্জশীট দেওয়ার পরও আগাম জামিন মঞ্জুর করা যায় [Ravindra Saxena’s Case(2010) 1 SCC 684]। যদিও ভারতে H.D.F.C-মামলায় (2009) Reported as 2010 1 SCC 679 মামলায় ভিন্নমত পাওয়া যায়। এই মামলায় আদালত মন্তব্য করেন, “Once the accused in the Charge Sheet, he has to surrender to the custody of the Court and pray for regular bail.” অর্থাৎ, একবার আসামীর বিরুদ্ধে চার্জশীট দেওয়া হলে তাকে নিন্ম আদালতে আত্নসমর্পন পূর্বক নিয়মিত জামিন চাইতে হবে। আমদের দেশে অবশ্য মামলার উভয় পর্যায়ে আদালত বিবেচনা প্রসূত আগাম জামিন মঞ্জুর করতে পারেন।

৭। এজাহার দায়ের করা আগাম জামিনের পূর্ব শর্ত নয়। মামলায় চার্জশীট প্রদান করা হয়েছে বা আসামীকে গ্রেফতারের জন্য ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়েছে- শুধুমাত্র এই গ্রাউন্ডেই আসামীর আগাম জামিনের অধিকার খর্ব করা হয়েছে বলা যাবে না।

উপরোক্ত বিষয়সমূহ সহ অন্য অনেক বিষয়ের মধ্যে আগাম জামিন মঞ্জুরের ক্ষেত্রে আদালত প্রধাণত নিন্মলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করে থাকেন—

১। অভিযোগের প্রকৃতি ও ভয়াবহতা;

২। আবেদনকারীর পূর্বপরিচয় সেই সাথে আবেদনকারী পূর্বে কখনও আমলযোগ্য অপরাধে দন্ডিত হয়েছিল কিনা সেম্পর্কে তথ্যাদি;

৩। জামিন পেলে আসামীর পলায়নের কোন সুযোগ ও সন্দেহ আছে কিনা?;

৪। আসামীর গ্রেফতারের মাধ্যমে তাকে সমাজের চোখে হেয় করা হবে- এমন উদ্দেশ্য নিয়ে উক্ত মামলায় তাকে জড়িত করা হয়েছে কিনা এ মর্মে অভিমত।

অন্যান্য বিষয়ের সাথে উপরোল্লিখিত নিয়ামক সমূহ বিবেচনা পূর্বক পরিস্থিতি বিবেচনায় আদালত কোন মামলায় আসামীর আগাম জামিন মঞ্জুর বা না- মঞ্জুর করে থাকেন। এবং যেক্ষেত্রে আসামীর আগাম জামিনের দরখাস্ত না-মঞ্জুর করেন সেক্ষত্রে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসামীকে গ্রেফতার করতে পারবেন।

আগাম জামিন আদেশের বলবতযোগ্যতার মেয়াদকাল

আমাদের দেশে সাধারণত জামিন মঞ্জুর কালে আগাম জামিনের মেয়াদ উল্লেখ করে দেওয়া হয় উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ৪ বা ৬ সপ্তাহের জন্য ইত্যাদি। সুতরাং মেয়াদ শেষ হবার পূর্বে জামিনের মেয়াদ আদালত কর্তৃক বৃদ্ধি করা না হলে উক্ত মেয়াদান্তে জামিন বাতিল বলে গণ্য হবে। এছাড়া, আদালত ইচ্ছা করলে এবং যুক্তি সঙ্গত মনে করলে মঞ্জুরকৃত জামিন আদেশ বাতিল করতে পারেন।

এক অপরাধের জন্য আগাম জামিন পেলে আসামীকে অন্য অপরাধের জন্য গ্রেফতার করা যাবে কিনা?

পূর্বেই বলা হয়েছে, আগাম জামিনের আবেদন করা হয় সু-নিদৃষ্ট কোন মামলা বা ঘটনা থেকে উদ্ভূত অভিযোগের প্রেক্ষিতে গ্রেফতারের আশঙ্কা থেকে। সুতরাং, আগাম জামিন কোন এক বিশেষ ঘটনা বা মামলাকে সামনে রেখে আদালত কর্তৃক মঞ্জুর হয়। সুতরাং, সুস্পষ্টভাবে আসামীর যদি অন্য কোন আমল যোগ্য অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় যার জন্য তাকে জামিন মঞ্জুর করা হয় নি – এমন মামলায় তাকে গ্রেফতার করতে কোন আইনী বাঁধা নেই। Gurbaksh Sing Sibia v. State of Panjab, AIR (1978) P&H 1 মামলায় আদালত বলেন যে, “The exercise of power under this section is with regard to a specific accusation and cannot be extended in blanket fashion to cover all offences which the petitioner may come to be charged.”

ভূমি সংক্রান্ত কিছু শব্দ

ভূমি সংক্রান্ত সাধারণ কিছু পরিচিত শব্দ আছে। শব্দগুলো আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি কিন্তু তার সঠিক ইতিহাস বা অর্থ অনেকের জানা নেই। আসুন জেনে নেই এমন কিছু শব্দের উৎপত্তি, ইতিহাস ও ব্যবহার।
C.S(Cadestral survey)- ১৮৮৮  সাল থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের তত্বাবধানে বাংলায় একটি ভূমি জরিপ হয় যাকে সিএস জরিপ বলে। রামু থানা থেকে শুরু হয়ে দিনাজপুরে এ জরিপ শেষ হয়। এটাই ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ভূমি জরিপ। এই জরিপে কৃত নকশাকে সিএস নকশা, খতিয়ানকে সিএস খতিয়ান বলে।
R.S(Revision survey)- ১৯৪০  থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সিএস জরিপের সংশোধনী জরিপকে আরএস জরিপ বলে। এই জরিপে কৃত নকশাকে আর.এস নকশা, খতিয়ানকে আর.এস খতিয়ান বলে।
S.A(State aquisition)- জমিদারী উচ্ছেদ হবার পর ১৯৫৬থেকে ১৯৬৩  সাল পর্যন্ত জমিদারদের নিকট থেকে অধিগ্রহণকৃত ভূ-সম্পত্তির হিসাব নির্ণয়ের জন্য যে জরিপ করা হয় তাকে এস.এ জরিপ বলে। এই জরিপে কৃত নকশাকে এস.এ নক্সা, খতিয়ানকে এস.এ খতিয়ান বলে।
R.S(Revision survey)- এস.এ জরিপের পর ১৯৬৫ সালে রাজশাহী হতে শুরু হয় ২য় আর.এস। এটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানব্যপি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ঢাকা শহর জরিপে এসে আইনী জটিলতার কারণে এ প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। এই জরিপে কৃত নকশাকে আর.এস নকশা, খতিয়ানকে আর.এস খতিয়ান বলে।
D.C.R(Duplicate carbon receipt)- উন্নয়ন কর বহির্ভূত সরকারি আয়ের জন্য দেয় যা দাখিলা নয় তাই ডিসিআর। যেমন হাট, বাজার, জলাশয়, জলমহাল ইত্যাদির ইজারা বা বন্দোবস্ত প্রদানের রশিদ।
B.S(Bangladesh survey)- বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় এই জরিপের কাজ সমাপ্ত হলেও কিছু কিছু এলাকায় আইনী জটিলতায় এখনো এই জরিপ শেষ হয় নাই। সে মতে এটি এখন চলমান জরিপ।
Mutition বা জমা খারিজ- জমিন সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র সাম্প্রতিক মালিকের নামে হালনাগাদ করাকে মিউটেশন বা জমা খারিজ বলে। ক্রয়কৃত ও উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির ক্ষেত্রে করা হয়।
খতিয়ান ও পরচা- ভূমির হিসাব যখন সরকারের রেজিষ্ট্রারে অন্তর্ভুক্ত থাকে তখন তাকে খতিয়ান এবং ব্যক্তির নিকট থাকে তখন পরচা বলে। উভয় ক্ষেত্রে একই বিষয় উল্লেখ থাকে। খতিয়ানের নকলই পরচা।
দাখিলা- ভূমির খাজনা পরিশোধপত্রকে দাখিলা বলে। ১৯৭২ সাল থেকে ২৫ বিঘা পর্যন্ত ভূমি মালিকানার খাজনা মওকুফ হলে ভূমির দখল স্বত্ব নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়। ১৯৮২ সালে এক সামরিক ফরমান বলে খাজনার পরিবর্তে একই হারে ভূমি উন্নয়ন কর ধার্য করা হয়। উন্নয়ন কর পরিশেধের রশিদের নাম দাখিলা।
সায়রাত মহাল- যে যে ভুমির জন্য ডিসিআর প্রদেয় তা সায়রাত মহাল। যেমন- বাজার, ঘাট, জলমহাল, বালুমহাল ইত্যাদি।
মৌজা
মৌজা রাজস্ব আদায়ের সর্বনিম্ন একক। মোগল আমলে কোন পরগনা বা রাজস্ব-জেলার রাজস্ব আদায়ের একক হিসেবে শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হতো। একগুচ্ছ মৌজা নিয়ে গঠিত হতো একটি পরগনা । বিংশ শতাব্দীতে মৌজা শব্দটি ব্যবহৃত হয় সামাজিক একক গ্রামের বিকল্প নাম হিসেবে এবং এই নামটি বেশ জনপ্রিয়তাও লাভ করে।
ঊনবিংশ শতাব্দী এবং তারও পূর্বে মৌজা সামাজিক ও রাজস্ব উভয়েরই একক হিসেবে চিহ্নিত হতো। এমন অনেক মৌজা ছিল যেখানে সামান্য কয়েকটি বসতবাড়ি ছিল অথবা আদৌ কোন বসতবাড়ি ছিল না। মৌজা ছিল শনাক্তকরণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য চিহ্ন। মৌজার অন্তর্গত নির্দিষ্ট পরিমাণ ভূমিতে ছিল গ্রামীণ বসতি বা স্থাপনা। অবস্থাভেদে এই বসতিগুলি ছিল ছড়িয়ে ছিটিয়ে অথবা একস্থানে কেন্দ্রীভূত। কেন্দ্রীভূত স্থাপনাগুলি সামগ্রিকভাবে গ্রাম বা পল্লী নামে পরিচিতি লাভ করে। জরিপ বিভাগ এবং রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীদের নিকট তাই শব্দদুটির (মৌজা ও গ্রাম) দুটি স্বতন্ত্র অর্থ রয়েছে। রাজস্ব নির্ধারণ এবং রাজস্ব আদায়ের জন্য এক ইউনিট জমির ভৌগোলিক অভিব্যক্তি ছিল মৌজা। অন্যদিকে গ্রাম ছিল মৌজার অন্তর্ভুক্ত শক্ত সামাজিক বন্ধনে গঠিত মনুষ্যবসতি। এভাবে একটি মৌজার অন্তর্গত একের অধিক গ্রাম থাকতে পারত এবং একইভাবে, একটি গ্রাম সন্নিহিত দুটি মৌজা নিয়ে গঠিত হতে পারত। বঙ্গদেশের পাললিক সমভূমিতে কেন্দ্রীভূত রীতিতে গ্রামবসতি খুব কমই গঠিত হয়েছে। ব্যক্তিক কৃষক পরিবার উন্মুক্ত মাঠে তাদের নিজস্ব ভূমির উপর বাস্তুভিটা নির্মাণ করা সুবিধাজনক মনে করত। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাকেরগঞ্জ জেলার সমতল ভূমিতে কদাচ গুচ্ছ বা কেন্দ্রীভূত গ্রাম ছিল। প্রতিবেশিতার বিষয় বিবেচনা না করেই এসব বসতবাড়ি নির্মাণ করা হতো। কিন্তু সিলেট ও ময়মনসিংহ জেলায় বিষয়টি এরকম ছিল না। সেখানে নদীতীরের উঁচু জমিতে কৃষকরা বৃহদাকার কেন্দ্রীয় গ্রামবসতি স্থাপন করত। উত্তরবঙ্গের জেলাসমূহে কতিপয় জলাশয়ের (পুকুর, দিঘি, ইত্যাদি) চারদিকে গুচ্ছগ্রাম নির্মাণ করা ছিল সাধারণ বৈশিষ্ট্য। একইভাবে, পরবর্তীকালে বঙ্গদেশের জেলাসমূহে ক্যাডাস্ট্রাল জরিপ পরিচালনাকালেও মৌজাকে সর্বনিম্ন রাজস্ব একক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। স্থানীয় রাজস্ব নকশায় জুরিসডিকশন লিস্ট (জেএল) এবং রেভিনিউ সার্ভে (আরএস) নম্বর দ্বারা একটি মৌজা শনাক্ত করা হতো। জরিপ বা সেটেলমেন্টের রেকর্ডপত্রে মৌজা শব্দটির ব্যবহার এখনও প্রচলিত।

Thursday, July 24, 2014

কেন এমন হয়!! এই দেশেতে মৃত্যু ভাগ্য তাদের কেন নয়?

নিচে আমার প্রিয় লেখক ডি এল রায় বা দ্বিজেন্দ্র লাল রায় এর একটা অতি পরিচিত কবিতার বলুন আর গানেরই বলুন তার একটি লাইল দিলাম। আমার লেখার শেষে পুরো গানের কথাগুলো দিব বন্ধুদের পড়ার জন্য। নিচের কথাগুলো গানের সুরে না হোক একটু পড়ে দেখুন কি সুন্দর কথা। প্রতিটি শব্দ হৃদয় ছুয়ে যায়।
‘‘আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’’
গানের এই লাইনটায় আমার কিছু কথা!! ‘আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি।’ আসলে সবার কপালে কি এই সৌভাগ্য হয়? এই দেশেতে জন্ম নেয়ার ভাগ্য অনেকেরই হয়। প্রতি বছর জ্যামিতিক হারে বাড়ে মানুষ। তারা আর কিছু পাক বা না পাক সুজলা, সুফলা, সশ্য শ্যামলা এই সোনার দেশে জন্ম নেয়ার ভাগ্য যে পেয়েছে সেটা নিশ্চিত। কিন্তু এই দেশেতে মরার সুযোগ কি পায়? আমার দেশের অনেক বড় বড়, ছোট ছোট, ছোট বড় লোক এই দেশেতে জন্মে এই দেশেতে মরতে পারে না। আমার কথাটা বিশ্বাস না হলে একটু মিলিয়ে দেখুন। আমাদের দেশের অনেক লোক কখনো ভারতে গিয়ে, কখনো হংকংয়ে গিয়ে, কখনো সিঙ্গাপুর গিয়ে, কখনো থাইল্যান্ড গিয়ে, কেউ কেউ আমেরিকা-লন্ডন-সুইজারল্যান্ডসহ নানা দেশে গিয়ে মৃত্যুবরণ করে!! দেশেই মারা যেতে পারতো। কিন্তু শেষ সময়ে চিকিৎসার ছুতোয় চলে যায় বিদেশে! সেখানে গিয়ে আর ফেরত আসেনা। পরে জোর করে লাশ নিয়ে আসা হয়! আমি মৃত্যু নিয়ে কোন রসিকতা করছি না। বা যারা বিদেশে চিকিৎসার জন্য যান তাদের হেয় করছি না। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয় তাদের ভাগ্য বিধাতা এই বঙ্গ মাতার কোলে শান্তিতে মরতে দিতে চায় না। তাই ছল ছুতোয় দেশের বাইরে নিয়ে যায়। যদিও জোর জবরদস্তি করে আবার দেশে আনা হয়। কিন্তু এই দেশেতে মরিবার সাধ মিটে না।
কেন এমন হয়??
আধুনিক ফতোয়া: আসলে এমনওতো হতে পারে! দেশের সাথে তারা এমন কিছু কাজ করেছে যার শাস্তি হিসাবে বিধাতা তাদের এদেশে মৃত্যভাগ্য হরণ করেছেন। কোটি কোটি মানুষ এই দেশের ডাক্তার, এই দেশের কবিরাজ, এই দেশের ফকির, এই দেশের ঝাড়ফুক নিয়ে বাঁচার আশায় বুক বাধে। যারা আমাদেরকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, অন্ন, বস্ত্র, নিরাপত্তা দিবে তারা কি তা দেয় ঠিকমত? নিজের স্বাস্থ্যর চেকআপ করার জন্য দেশের বাইরে চলে যায়, নিজেদের আখের গোছাতে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা সৃষ্টি করে নিজের সন্তানকে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন। লাখো মানুষের বাসস্থান থাকুক বা না থাকুক, নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের তাদের থাকে একাধিক আলিশান বাড়ি, ফ্ল্যাট। আবার অনেকে দেশের গন্ডি পেরিয়ে মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সেকেন্ড হোমল্যান্ড হিসাবে বেছে নেয় বিদেশ, বিদেশে গড়ে স্বপ্নের বাড়ি। ছেড়া কাপরে লজ্জা ঢাকতে পারেনা হাজারো মা। যারা নিশ্চিত করবে তাদের ছেলে-মেয়ে-বউ দেশি কোন পোষাকই গায়ে চড়াতে চায় না। প্রতিদিন হাজারো শিশু কাদে খিদের জালায়। তাদের মুখে অন্ন নিশ্চিত করার কথা যাদের তাদের বাবুটা কিছুই খেতে চায় না কিন্তু ফাষ্টফুডের দোকানে ঢুকলে হাজার হাজার টাকা বিল হয়, না খেয়ে সেই শুকিয়ে যাওয়া বার-পনের বছরের বাবুটার ওজন ৯০ থেকে ১০৫ কেজি।
আমাদের অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব থাকে যে নেতার কাছে, যে অফিসারের কাছে, যে ব্যবসায়ীর কাছে, যে শিক্ষকের কাছে, যে সমাজ সেবকের কাছে সে তার দায়িত্ব পালন না করে দেশের সাথে বেইমানি করেছে বলেই আমার মনে হয় তাদের এই দেশে মৃত্যুভাগ্য হয় না! যা আমাদের সাধারণ মানুষের ও দেশের হক নষ্ট করে। এই অপরাধ আমরা আপাত দৃষ্টিতে দেখিনা বা বুঝতে পারি না কিন্তু বিধাতা তো ঠিকই দেখে! সৃষ্টিকর্তাতো এক মহান বিচারক, সে ঠিকই বিচার করে! ফলে দেশের মাটিতে তার আর মরা হয় না। মরার পর দেশে আসে। তাই আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, কেন এমন হয়!! এই দেশেতে মৃত্যু ভাগ্য তাদের কেন নয়? ধনধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা
তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা
ও সে স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে যে স্মৃতি দিয়ে ঘেরা
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি
সে যে আমার জন্মভূমি, সে যে আমার জন্মভূমি।।
পুষ্পে পুষ্পে ভরা শাখি কুঞ্জে কুঞ্জে গাহে পাখি
গুঞ্জরিয়া আসে অলি পুঞ্জে পুঞ্জে ধেয়ে
তারা ফুলের ওপর ঘুমিয়ে পড়ে ফুলের মধু খেয়ে।।
ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ
ওমা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি
আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি।।
(সংশোধিত)